স্বতন্ত্রদের সংরক্ষিত আসন বণ্টন হবে যেভাবে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে ৩০ জানুয়ারি। ৩০০ সংসদ সদস্যের সাথে যুক্ত হবে আর ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আইনপ্রণেতা। ভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে বন্টন হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা।

এবারের নির্বাচনে নির্বাচিত ৬২ স্বতন্ত্র আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত নারী আসন থাকছে ১০টি। এই আসনগুলোতে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে স্বতন্ত্রদের সামনে একাধিক পথ খোলা থাকলেও, তারা কী করবেন তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি। তবে উদ্ভূত নতুন এই পরিস্থিতি সংবিধান মেনেই মোকাবেলা হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে আগামী রোববার গণভবনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ডেকেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কে, কয়টা পাবে

আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনে জয়ী দল বা জোটগুলোর মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। সাধারণভাবে প্রতি ছয়টি আসনের বিপরীতে কোনো দল বা জোট একটি সংরক্ষিত আসন পেয়ে থাকে। সে অনুযায়ী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পাচ্ছে ৩৭, স্বতন্ত্র পাচ্ছে ১০ জাতীয় পার্টি দুটি ও অন্যরা একটি আসন।

গত সাত জানুয়ারির ভোটে ২৯৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২২৩ আসন। এছাড়া জাতীয় পার্টি ১১ এবং ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও কল্যাণ পার্টি একটি করে আসন পেয়েছে।

এবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬২ জন নির্বাচিত হয়েছেন। এতো স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও দেশে এই প্রথম।

অংশগ্রহণমূলক ভোট উৎসাহিত করতে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচন জিতে আসা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা। তারা নৌকা প্রতীক না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে কয়েকজন ব্যবসায়ীও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এবারই প্রথম সংরক্ষিত আসন পেতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা একাধিক বিকল্প পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তারা চাইলে কোনো রাজনৈতিক দলের জোটভুক্ত কিংবা নিজেরা আলাদা জোট করতে পারেন। তা না হলে তাদের নির্দলীয় সদস্য হিসেবে তালিকা করবে ইসি। পরে তাদের আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হবে।

parliament (2)

আসন বণ্টনের নিয়ম

সংরক্ষিত আসনগুলো কোন প্রক্রিয়ায় বণ্টন হবে তা আইনে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। সাধারণভাবে প্রতি ছয়টি আসনের বিপরীতে কোনো দল বা জোট একটি সংরক্ষিত আসন পেয়ে থাকে।

আসন বণ্টনের বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত আসনের মোট সংখ্যাকে (বর্তমানে ৫০টি) সংসদের সাধারণ আসনের মোট সংখ্যা (৩০০টি) দ্বারা ভাগ করার পর ভাগফল হিসাবে প্রাপ্ত সংখ্যা (১.৬৬৭) দিয়ে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল বা জোটের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের মোট আসন সংখ্যাকে গুণ করে যে সংখ্যা পাওয়া যাবে সেই সংখ্যাই হবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোটের অনুকূলে বণ্টনতব্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা।
অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের ২২৩টি আসনের বিপরীতে সংরক্ষিত আসন হবে– ৫০x৩০০=০.১৬৬৭। এরপর ২২৩x০.১৬৬৭=৩৭.১৬৬৭। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ৩৭টি আসন পাবে।

আইন অনুযায়ী ভগ্নাংশ শূন্য দশমিক পাঁচ (০.৫) বা তার বেশি হলে ভগ্নাংশকে পূর্ণ এক সংখ্যা গণনা করতে হবে এবং শূন্য দশমিক পাঁচ (০.৫) অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর হলে ওই ভগ্নাংশকে শূন্য সংখ্যা গণনা করতে হবে।

আইনে আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের পর বণ্টন করা আসনগুলোর যোগফল ৫০ (সংরক্ষিত মোট আসন) এর চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত আসন বা আসনগুলো নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাটা হবে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত আসনের সংখ্যা একটি হলে, যেসব দল বা জোট আনুপাতিক হারের ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যা গণনা করার কারণে কোনো আসন পেয়েছে, সেসব দল বা জোটের মধ্যে ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের অধিকারীর অনুকূলে বরাদ্দ করা আসন থেকে ওই অতিরিক্ত আসনটি কাটতে হবে। তবে ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশের অধিকারী দল বা জোটের সংখ্যা একাধিক হলে কার আসন কাটা যাবে, তা লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। অতিরিক্ত আসন সংখ্যা একাধিক হলে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের পর বণ্টন করা আসনসমূহের যোগফল ৫০-এর কম হলে এবং অবশিষ্ট আসনের সংখ্যা একটি হলে তা যে রাজনৈতিক দল বা জোটের অনুকূলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সংরক্ষিত মহিলা আসন বণ্টন করা হয়েছে তাদের অনুকূলে বণ্টন হবে।

আইনে আসন বণ্টনে ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যা গণনার বিষয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

আইনের এই বিধান অনুসারে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পাবে–১১x০.১৬৬৭= ১.৮৩৪টি, অর্থাৎ দুটি আসন। এককভাবে জোটবদ্ধ হলে স্বতন্ত্রদের সংরক্ষিত আসন হবে ৬২x ০.১৬৬৭ =১০.৩৩৪টি, অর্থাৎ ১০টি আসন। আর ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও কল্যাণ পার্টি জোটবদ্ধ হয়ে এলে পাবে ৩x০.১৬৬৭=০.৫০টি, অর্থাৎ একটি আসন।

তবে স্বতন্ত্ররা এককভাবে জোটবদ্ধ না হলে খণ্ড খণ্ডভাবে জোট করলে এই হিসাব বদলে যাবে। তারা পাঁচ বা ছয় জন করে খণ্ড খণ্ড জোট হলে ১১টি আসন পাবে। একই প্রক্রিয়ায় ১১ জন করে জোট করলে পাঁচটি জোটের অনুকূলে ১০টি সংরক্ষিত আসনে ও বাকি সাত জনের অনুকূলে আরও একটি সংরক্ষিত আসন পাবেন। ইচ্ছা করলে স্বতন্ত্ররা ৪/৫/৬ জন করে জোট করে একটি করে আসন দাবি করলেও আইনে বাধা থাকবে না। এক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা নির্ধারিত ৫০টি ছাড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি হস্তক্ষেপ করতে হবে। কিংবা বরাদ্দ সংরক্ষিত আসনগুলোতে সরাসরি নির্বাচন করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা কী করবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও হয়নি। এসব বিষয়েও তাদের অনেকে তাকিয়ে আছেন দলীয় সভাপতি সংসদ নেতা শেখ হাসিনার দিকে। তবে ধারণা করা হচ্ছে রোববার সংসদ নেতার সঙ্গে বৈঠকে দিকনির্দেশনা আসতে পারে।

parliament_building

গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ নিগার বলেন, সংরক্ষিন আসনের বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। বিষয়টি নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি।

ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটিই আসলে আমার সিদ্ধান্ত।

মাদারীপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য তাহমিনা বেগম বলেন, সম্মিলিতভাবে বসে সংবিধান অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেবো। বতে সতর্ক থাকতে হবে কেউ যাতে বাণিজ্য করতে না পারে।

এদিকে তিনবারের স্বতন্ত্র সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলছেন, একাদশ সংসদের মতো এবারো স্বতন্ত্রদের জন্য সংরক্ষিত নারী আসনে কারা আসবেন, তাদের নির্বাচনরে ভার সংসদ নেতার হাতে ছেড়ে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার মনে হয় এটা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছেড়ে দিলে তিনি দলের পরীক্ষিত যারা তাদের মনোনয়ন দেবেন। এটা তার হাতেই ছেড়ে দেব।

অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন এই পরিস্থিতি সংসদ নেতা ও স্পিকার সংবিধান মেনেই মোকাবেলা করবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, এটা একটা নতুন পরিস্থিতি। সংসদের স্পিকার এবং সংসদ নেতা সেই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেবেন।

আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন করতে হয়। সে হিসাবে আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে এই নির্বাচন করতে হবে। আগামী মার্চের মধ্যে ভোট করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। তবে ২০ ফেব্রুয়ারির পরে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। তাই ফেব্রুয়ারির শেষে স্পষ্ট হবে সংরক্ষিত নারী আসনে কারা হবেন সংসদ সদস্য।