বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহেল রানা ২০১৫ সালে গুমের শিকার হন। তাকে ঢাকার উত্তরা থেকে তুলে নিয়ে টানা ৬ মাস ৩ দিন (১৮৬ দিন) গোপনে আটক রাখা হয়। এই দীর্ঘ সময় তিনি অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষ করে শেষ দুই মাস তাকে একটি অন্ধকার ও দুর্গন্ধময় শৌচাগারে বন্দি করে রাখা হয়।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, সেখানে মানুষের ন্যূনতম মর্যাদা ও বেঁচে থাকার মৌলিক শর্তগুলো থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হয়। দিন-রাত মশার কামড়, শারীরিক অত্যাচার, ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ের মধ্যে তিনি প্রতিদিন টিকে ছিলেন। সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা আজও আমাকে জীবনকে তাড়া করে বেড়ায়।
গুম থেকে ফিরে সোহেল রানা এটিকে কেবল নিজের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেননি, বরং পুরো জাতির জন্য এক গভীর সংকট হিসেবে দেখেছেন। তার উপলব্ধি ছিলো—গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি জাতির মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে চূর্ণ করার একটি ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি।
সেই উপলব্ধি থেকে তিনি গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে গুমের উপর সর্বপ্রথম তিনি মামলা দায়ের করেন। পাশাপাশি গুমকে সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইনে সংযুক্ত করার দাবিতে তিনি কাজ করে গেছেন। আইনজীবী সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় রূপ দেন।
একই সঙ্গে তিনি একটি স্বাধীন ও কার্যকর ‘গুম কমিশন’ গঠনের দাবিও তোলেন, যাতে প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য সত্য প্রকাশ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও—জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুম ইস্যুটি তুলে ধরেছেন।
আইনজীবী সোহেল রানা মনে করেন, এই সংগ্রাম তার ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা বেদনার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য একটি দায়িত্ব।