জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মত-দ্বিমতের আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতেও সুরাহা হয়নি এটির বাস্তবায়ন পদ্ধতি। কোনো রাজনৈতিক দল বলেছে, বিচার বিভাগের পরামর্শ নিতে। কারো চাওয়া গণপরিষদ নির্বাচন কিংবা গণভোট। আবার কমিশনের প্রস্তাবনার সাথে মিলিয়ে সাংবিধানিক আদেশেরও পরামর্শ দিয়েছে কিছু দল। তবে যেভাবেই বাস্তবায়ন হোক, নির্বাচিত সরকার সনদ বাস্তবায়নে পিছু হটলে, সেই সরকারকে অবৈধ বলে ঘোষণাও করেছে কেউ কেউ।
জাতীয় জুলাই সনদ। গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্য গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের লক্ষ্য সুপারিশমালা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর এক ধরনের ঐকমত্য হয়। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে জাতীয় জুলাই সনদ। কিন্তু এই জুলাই সনদ কিভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের কাছে।
জুলাই সনদের বাস্তনায়ন প্রক্রিয়া ও অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা করতে রোববার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ কমিশনের অন্যান্য সদস্য ও রাজনৈতিক অংশীদাররা।
আলোচনা শেষে রাজনৈতিক দলগুলো জানায়, এখনও চূড়ান্ত হয়নি সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। দিয়েছেন নানা পরামর্শও। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের উপরে সনদকে স্থান দেয়া যাবে না। সংবিধানের সংশোধনী আনার জন্য এক্সট্রা কনস্টিটিউশনাল অর্ডার বা আইনি পন্থার বাইরে গিয়ে সনদ বাস্তবায়ন চায় না বিএনপি। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন সংসদের বাইরে হতে পারে না।
তিনি বলেন, জাতির কাছে এমন কোনো নির্দশন রেখে যাওয়া ঠিক হবে না যা দু’দিন পর টিকবে না। নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়লে আঞ্চলিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই সবকি ছু সমাপ্ত হবার কথা ছিল। ঐক্যমত কমিশনের কাজও শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়- যদি এর কোনো আইনি ভিত্তি না থাকে, তবে তারা এই সনদে সই করতে পারব কি না চিন্তা করতে হবে। তখন আমরা বলেছি, আসুন আলোচনা করি- কীভাবে এটিকে আইনি ভিত্তি দেয়া যায়। পরবর্তীতে আলোচনা শুরু হলো। তার আগেই বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি, সনদে স্বাক্ষর হয়ে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হোক, অনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরিত হোক, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে উল্লেখ থাকুক- এভাবেই জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যায়। যারা ম্যান্ডেট পাবে, তারা সংসদে গিয়ে বাধ্য থাকবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনুগত থাকতে।
সালাহউদ্দিন বলেন, তবে যদি প্রশ্ন আসে- গ্যারান্টি কোথায়? সেজন্যই আমরা বলেছি আইনি ভিত্তি থাকা দরকার। চাইলে অ্যাপিলেট ডিভিশনের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ হলেও বলা যাবে-বিচার বিভাগের পরামর্শ নেয়া হয়েছিল। আমরা শুধু চাই- অনিশ্চয়তা কেটে যাক। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন-এগুলোকে কখনোই একে অপরের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষ করা যাবে না। সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া, বিচারও চলবে। অবিচারের শিকার আমরা সবচেয়ে বেশি হয়েছি। কিন্তু নির্বাচনের সঙ্গে এসবকে যুক্ত করলে সেটা জাতির জন্য ক্ষতিকর হবে।
জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের নির্বাচন ফেব্রুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে হবে। এ নিয়ে যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে সেটা গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং জাতীয় এমনকি আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করতে পারে। আমরা বাংলাদেশকে সে অবস্থায় নিতে চাই না।
এদিকে, সাংবিধানিক আদেশে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চায় জামায়াতে ইসলামী। আর এটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য গণভোটের দাবি জানিয়েছে দলটি। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, সনদ প্রণয়নে সবাই একমত। এর আইনি ভিত্তির বিকল্প নেই। সাংবিধানিক আদেশে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে না।
কেউ জুলাই সনদ না মানলে নির্বাচনে তাকে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করেছে জামায়াত। এই প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, জামায়াত আইনানুগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই রাজনীতি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে মেনে নিয়েই জামায়াত রাজনীতি করছে। ৭১ না মানলে বাংলাদেশকে অস্বীকার হয়। ২৪কে না মানলেও ভবিষ্যতে রাজনীতি করা কঠিন।
সংস্কারের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিষয়গুলোতে সমাধানে আসতে হবে জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, গণপরিষদই হতে পারে সমাধান।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, শেষপ্রান্তে এসে আমরা আশা হারাতে চাই না। সংস্কারের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিষয়গুলোতে সমাধানে আসতে হবে। এতোদিনের আলোচনায় জুলাই সনদ যেন আইনি ভিত্তি পায় সেটা আমরা চাই। ৮৪ পয়েন্টের মধ্যে ৪৩টি সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত, গণপরিষদের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করেছে, আমরা প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। এখন বাস্তবায়নের বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পালা। আমরা ঐকমত্য কমিশনের সভাপতির কাছে বিনীত অনুরোধ করবো, আমাদের আলোচনা প্রায় গুছিয়ে নিয়ে এসেছি। কমিশনের সময় প্রায় শেষের দিকে। কমিশন আরও কিছুদিন সময় যদি পায় সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে কমিশনের সহযোগিতায় আমরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিকে অগ্রসর হতে পারবো।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। গত ১২ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই হিসেবে সোমবার কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।