দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: গণনেতা হয়ে ফিরছেন তারেক রহমান

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে এক অপরাজেয় বীরের বেশে স্বদেশে ফিরছেন বাংলাদেশের রাজনীতির বরপুত্র- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার তাঁর এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- পুরো বাংলাদেশে বইছে এক অভূতপূর্ব আবেগ ও উচ্ছ্বাসের জোয়ার। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তিনি ফিরছেন এমন এক সময়ে, যখন জাতি এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।

তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে তাই বলা হচ্ছে আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে ছিল ষড়যন্ত্রের পাহাড়, অন্যদিকে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও দীর্ঘ প্রবাস জীবন। কিন্তু সময় আজ সব কিছুর উত্তর দিয়ে দিয়েছে। পাহাড়সম মিথ্যা অভিযোগ আর অপপ্রচারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজকীয় বেশে দেশের মাটিতে পা রাখছেন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন তিনি।

যাত্রাপথ ও সফরসঙ্গী

বুধবার যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা) লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে তারেক রহমান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সাথে থাকছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং তাঁদের আদরের পোষা বিড়াল ‘জেবু’। ঢাকায় পৌঁছানোর আগে বিমানটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করবে।

প্রথম অগ্রাধিকার মমতাময়ী মা

বিএনপি সূত্রে জানানো হয়েছে, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে তাঁর অসুস্থ মা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়া। বর্তমানে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মায়ের পাশে কিছুক্ষণ একান্তে সময় কাটিয়ে তিনি গুলশানের বাসভবনে ফিরবেন।

৩০০ ফিটে সংক্ষিপ্ত গণঅভ্যর্থনা

যদিও তারেক রহমান বড় কোনো আড়ম্বর চাননি, কিন্তু লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যাত্রাপথের মাঝামাঝি কুড়িল-পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে (যাকে দলীয়ভাবে ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’ বলা হচ্ছে) এলাকায় একটি সংক্ষিপ্ত গণঅভ্যর্থনা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তিনি কৃতজ্ঞ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে অতি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেবেন।

প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী কর্মসূচি

স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদ বুধবার এক সম্মেলনে জানান, দেশে ফেরার পরের তিন দিন তারেক রহমানের ঠাসা কর্মসূচি রয়েছে। শুক্রবার বাদ জুমা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত এবং সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন।

শনিবার নির্বাচন কমিশনে এনআইডি কার্যক্রম সম্পন্ন করা, শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত এবং পঙ্গু হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনে আহতদের পরিদর্শন।

সংগ্রামের পথ ও ইতিহাসের সত্যতা

তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। ২০০১-২০০৬ শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে যে ‘হাওয়ার ভবন’ বা ‘প্যারালাল গভর্নমেন্ট’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছিল, আজ দেড় যুগ পর মানুষ বুঝতে পেরেছে তার অধিকাংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 

এক এগারোর সরকারের সময় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত নিয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সেখান থেকেই দলের হাল ধরেছেন।

২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ করার পর আট হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি যেভাবে বিএনপিকে একতাবদ্ধ রেখেছেন, তা বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ভাইয়ের মৃত্যু (আরাফাত রহমান কোকো), মায়ের কারাবাস এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীর গুম-খুনের দুঃসময়েও তিনি দমে যাননি। 

তাঁর স্লোগান- “বাংলাদেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে” বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আন্দোলনের মন্ত্র হিসেবে গেঁথে গেছে।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

তারেক রহমানের ফিরে আসা মানে শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত সোপান। তাঁর নেতৃত্বে দেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে এবং নাগরিক অধিকার ফিরে আসবে- এমনটাই এখন সর্বজনীন প্রত্যাশা।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে যখন বাংলার আকাশে তাঁর বিমানটি চক্কর দেবে, তখন এক নতুন সূর্যের অপেক্ষায় প্রহর গুনবে ৫৬ হাজার বর্গমাইল।