শচীনের যে ইনিংস উদযাপিত হয় জন্মদিনের মতো

ছাপাখানা থেকে কেবল বেরিয়েছে গ্রেটেস্ট অভ অল টাইম ডন ব্র্যাডম্যানের লেখা বই ‘ব্র্যাডম্যানস বেস্ট’। ডন সে বইতে শচীন টেন্ডুলকারকে বেস্ট হিসেবে আখ্যা দিলেও, ব্যাপারটা আদতে ছিল পুরোদস্তুর বিব্রতকর, ফর্মটা নেই সেরার ধারে কাছে।

এক বছরের বেশি পেরিয়ে গেছে, টেন্ডুলকারের ব্যাটে সেঞ্চুরি আসে না, উপরে থাকা ঈশ্বরকে ‘থ্যাংক ইউ’ বলার জন্য মাথাটা আর তাকায় না। ঘোরতর খারাপ সময়ে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই চলছে ভারতের পরীক্ষা। ০, ১, ৩৭, ০, ৪৪... শচীন টেন্ডুলকারের রানগুলো মোবাইল ডিজিটের মতো, সে কারণে যতটা, তার থেকে বেশি আলোচনা-সমালোচনা ভিন্ন একটা কারণে।

স্টিভ ওয়াহর টিমের স্ট্র্যাটেজি একটাই... অফ স্ট্যাম্পের বাইরে ডেলিভারি... কাভার ড্রাইভ বাউন্ডারি শট খেলতে গিয়ে কখনো স্লিপে, কখনো উইকেট কিপারের গ্লাভসে, আউট বারে বারে। অথচ কাভার ড্রাইভই শচীনের সহজাত, ওটা থেকে বাউন্ডারি বের করা ওর ব্যাটিংয়ের সিগনেচার। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যেন, শেক্সপিয়র ভুলে গেছে তার হেমলেট, আর রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা গীতাঞ্জলি।

অফ স্ট্যাম্পের বাইরের পাতা ফাঁদ, টানা পাঁচ ম্যাচে একই ঘটনা ঘটার পর, শচীন সিদ্ধান্ত নিলেন ওই শটটাই তিনি খেলবেন না। কিন্তু কাভার ড্রাইভের মতো অত্যাবশ্যকীয় শট ছাড়া কোন ইনিংস খেলে কামব্যাক করা... বড় রান করা... এটা প্রায় অসম্ভব।

যেটা কেউ করতে পারেনি সেটাই করলেন শচীন। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুধু যে সেঞ্চুরি করলেন তা নয়, তার ওয়াগন হুইলটা আশ্চর্য, কাভার ড্রাইভ নেই একটাও।

পরে দেওয়া ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, কোথায় সমস্যা আর কী করণীয়... আগের রাতে সর্বক্ষণের ক্রিকেটীয় সহচর-পরামর্শক ভাই অজিত টেন্ডুলকার জানিয়েছিল চ্যালেঞ্জ। ‘কাভার ড্রাইভ ছাড়া, আনবিটেন নক খেলে দেখাও’। হয়েছিলও তাই, সেঞ্চুরিকে কনভার্ট করেছিলেন ২৪১ রানের নটআউট নক। পুরো ইনিংসের ওয়াগন হুইলটা অবিশ্বাস্য, সব শট আছে কিন্তু কাভার ড্রাইভটা নেই। সেঞ্চুরির করার সময়ের অফ স্টাম্পের বাইরে ফেলা লোভনীয় সমস্ত ডেলিভারি দিয়েছেন ছেড়ে, খেলেননি যেই শট খেলে আউট হচ্ছিলেন সেটা। বাকি আরও ১৪১ রান করার পথে অফ সাইডে শট খেললেও কাভার ড্রাইভে বাউন্ডারি মারার অপশন, ব্যবহারই করেননি।

ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয়-বরণীয় নকের সংখ্যা তো কম নয়। তবে নো কাভার ড্রাইভ, টু-ফোর-ওয়ান নটআউট, এট সিডনি, প্রতি বছর তেসরা জানুয়ারি দুই দশকের বেশি সময় পেরোনোর পরও, ইনিংসটাকে আজও স্মরণ করে ক্রিকেট ফ্যানাটিকরা।

ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আপনাকে একটা ব্ল্যাংক চেক দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই করছেন না সই। শৃঙ্খলা আর ধৈর্যের মানে আসলে কী হতে পারে... সেই মানের ক্রিকেটীয় অনুবাদ হিসেবে দেখা হয় শচীনের ইনিংসটাকে।

কোথাও কোথাও হারতে হয় যদি আপনি সত্যিকার অর্থে জিততে চান, জিতে যাওয়ার মানে সবসময় সবজায়গায় জিতে নেওয়া নয়। জানান দেয় সিডনির কাভার ড্রাইভ বিহীন দুশো একচল্লিশ।