রোববার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যখন ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হবে, সেই লড়াই শুধু মাঠের ক্রিকেটের জন্যই নয়, বরং আসরকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তাপের কারণেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে রয়েছে কয়েক দশকের যুদ্ধ ও বৈরী সম্পর্কের ইতিহাস। অতি সম্প্রতি, ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশ চার দিনের এক আন্তঃসীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। ৭৮ বছরের এই তিক্ত ইতিহাস খেলার মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এতটাই উসকে দিয়েছে, এর ফলে বারবার টুর্নামেন্ট বয়কট, ম্যাচ বাতিল এবং মাঠে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটেছে।
মে মাসের সেই সংঘাতের পর ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট সম্পর্কের অবনতি এবং রাজনীতিতে জর্জরিত মাঠের কিছু ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১৪ সেপ্টেম্বর: হ্যান্ডশেক বিতর্ক
বিতর্কের শুরু হয় যখন ভারতের সূর্যকুমার যাদব টসের আগে পাকিস্তানের সালমান আলী আগার সঙ্গে প্রথাগত করমর্দন (হ্যান্ডশেক) এড়িয়ে যান। ম্যাচের শেষে সূর্যকুমার এবং শিবম দুবে জয়সূচক রান নিয়ে ফেরার সময়ও পাকিস্তানি অধিনায়ক বা দলের সঙ্গে কোনো করমর্দন করেননি।
ভারতের পুরো দল একে অপরের সঙ্গে হাত মেলালেও ড্রেসিংরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়, আর পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা বাইরে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন। পরে সূর্যকুমার নিশ্চিত করেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং এর কারণ ছিল মে মাসের সংঘাতের আগে জম্মু-কাশ্মীরে হওয়া সন্ত্রাসী হামলা।
১৭ সেপ্টেম্বর: ম্যাচ বয়কট ও রেফারির ওপর ক্ষোভ
হ্যান্ডশেক বিতর্কের জেরে এশিয়া কাপের পরের ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে মাঠে নামতে অস্বীকার করে পাকিস্তান। তারা দাবি তোলে, ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটকে সরিয়ে দিতে হবে, কারণ ভারতের অনুরোধে ভারত-পাক ম্যাচে তিনিই দুই অধিনায়কের করমর্দন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পাইক্রফট ‘ভুল বোঝাবুঝির’ জন্য ক্ষমা চাইলে এক ঘণ্টা পর খেলা শুরু হয়।
২১ সেপ্টেম্বর: বাকযুদ্ধ ও সংঘাতের ইঙ্গিত
এশিয়া কাপের দ্বিতীয় দেখায় মাঠে খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। পাকিস্তানের হারিস রউফ এবং ভারতের অভিষেক শর্মার মধ্যে সংঘাত চরমে পৌঁছায়। বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করার সময় রউফ হাতের ইশারায় ‘৬’ ও ‘০’ দেখিয়ে ভারতের ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পাকিস্তানি দাবিকে ইঙ্গিত করেন।
এছাড়া তিনি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রতীকী ইশারাও দেখান। এর জবাবে বিসিসিআই আইসিসি’র কাছে অভিযোগ জানায়। অন্যদিকে, অর্ধশতকের পর ‘বন্দুকের গুলি’ ছোড়ার ভঙ্গিতে উদযাপন করায় পাকিস্তানের সাহেবজাদা ফারহানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে।
২৮ সেপ্টেম্বর: ট্রফি নিতে ভারতের অস্বীকৃতি
এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জিতলেও ভারত ট্রফি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এর কারণ ছিল ট্রফি প্রদানকারী মহসিন নকভি, যিনি একই সঙ্গে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) এবং পিসিবির চেয়ারম্যান, পাশাপাশি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের আপত্তির কারণে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এক ঘণ্টার বেশি বিলম্বিত হয় এবং ভারতীয় দল ট্রফি ছাড়াই বিজয় উদযাপন করে।
৫ অক্টোবর: নারী ক্রিকেটেও প্রভাব
শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের আইসিসি নারী বিশ্বকাপেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে একই দৃশ্য দেখা যায়। পুরুষ দলের পথ অনুসরণ করে ভারতীয় নারী দলও পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন থেকে বিরত থাকে।
৪ নভেম্বর: আইসিসির নিষেধাজ্ঞা
এশিয়া কাপ শেষ হওয়ার পাঁচ সপ্তাহ পর আইসিসি সূর্যকুমার যাদব, হারিস রউফ এবং সাহেবজাদা ফারহানকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। সূর্যকুমার ও রউফকে তাদের ম্যাচ ফির ৩০ শতাংশ জরিমানা এবং দুই ডিমেরিট পয়েন্ট দেওয়া হয়। ফাইনালে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার উদযাপন করায় ভারতীয় পেসার জাসপ্রিত বুমরাহকেও একটি ডিমেরিট পয়েন্ট দেওয়া হয়।
২৫ জানুয়ারি – টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয়
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বহিষ্কার করার পর, পাকিস্তান টুর্নামেন্টে তাদের নিজেদের উপস্থিতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার কথা জানায়। পিসিবি প্রধান মহসিন নকভি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই মুহূর্তে পাকিস্তানে নেই। তিনি ফিরে এলে আমরা আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনাদের জানাতে পারব।
ফেব্রুয়ারি ১-৯: বয়কট ও ইউ-টার্ন
১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে, তারা ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে ৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং শ্রীলঙ্কা ও আরব আমিরাতের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তারা অবশেষে রবিবারের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেয়।