দলীয় ট্রফি জিততে না পারার আক্ষেপ হয়তো থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে এবারের আইপিএলে সব আলো একাই কেড়ে নিয়েছেন ‘বিষ্ময় বালক’ বৈভব সূর্যবংশী। তাঁর দল রাজস্থান রয়্যালস ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হলেও, ১৫ বছর বয়সী এই বিহারের কিশোর-প্রতিভা টুর্নামেন্টজুড়ে এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন যা আইপিএলের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। এবারের আসরে ব্যক্তিগতভাবে একাই পাঁচটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন এই ক্রিকেট বিস্ময়।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে বৈভবের হাতে উঠেছে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের ‘অরেঞ্জ ক্যাপ’, যা তিনি জিতেছেন আসরে সর্বোচ্চ ৭৭৬ রান করার কৃতিত্বে। একই সাথে ১৬ ইনিংসে ২৩৭.৩০-এর অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেটের জন্য তাঁর ঝুলিতে গেছে ‘সুপার স্ট্রাইকার অব দ্য সিজন’-এর পুরস্কার। শুধু তাই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে বোলারদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭২টি ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি জিতে নিয়েছেন ‘সুপার সিক্সেস অব দ্য সিজন’ ট্রফিও।
তবে এই তিনটি পুরস্কারকেও ছাপিয়ে গেছে তাঁর জেতা বাকি দুটি স্বীকৃতি। বৈভব সূর্যবংশী এবারের আসরের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় বা ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’ (এমভিপি) এবং ‘উদীয়মান সেরা খেলোয়াড়’ (বেস্ট ইমার্জিং প্লেয়ার) নির্বাচিত হয়েছেন।
আইপিএলের দীর্ঘ ইতিহাসে তিনিই প্রথম ক্রিকেটার, যিনি একই মৌসুমে একই সাথে এমভিপি এবং উদীয়মান সেরা খেলোয়াড়ের জোড়া মুকুট মাথায় পরলেন। এর পাশাপাশি ২০১১ সালে কিংবদন্তি ক্রিস গেইলের পর বৈভবই প্রথম ব্যাটার, যিনি একই মৌসুমে রান ও স্ট্রাইক রেট, উভয় তালিকাতেই শীর্ষে থাকার অনন্য কীর্তি গড়লেন। এমনকি এক আসরে গেইলের করা ৫৯টি ছক্কার পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ৭২টি ছক্কা মারার নতুন ইতিহাস গড়েছেন এই কিশোর।
অথচ দলগতভাবে বৈভবের ভাগ্যটা এতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে অবিশ্বাস্য খেলে দলকে প্লে-অফে তুললেও, দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে গুজরাট টাইটান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় রাজস্থান রয়্যালসকে। আর গতকাল আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে সেই গুজরাটকে হারিয়েই টানা দ্বিতীয়বারের মতো আইপিএল শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে বিরাট কোহলির রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
ফাইনালে রাজস্থানের প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও, সমাপনী অনুষ্ঠানে এককভাবে পাঁচটি ট্রফি বগলদাবা করতে যখন মঞ্চে ওঠেন বৈভব, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো দর্শক করতালিতে মুখরিত করে তোলে চারপাশ। এত বড় অর্জনের পর এমভিপি হওয়ার প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে বিহারের এই সহজ-সরল কিশোর স্বভাবসুলভ লাজুক হেসে বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে, তবে এত এত সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণে কিছুটা চাপও অনুভব করছি। এটি আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি মুহূর্ত। আগামী মৌসুমেও এই ফর্ম ধরে রেখে আরও ভালো করার চেষ্টা করব।’
মাঠে নামার পর প্রথম বল থেকেই বোলারদের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতা নিয়ে এই খুদে ব্যাটিং দানবের সরল ভাষ্য, ‘আমি সব সময় আমার সহজাত খেলাটাই খেলার চেষ্টা করি। বল যদি মারার মতো পজিশনে থাকে, তবে সেটির পুরো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা থাকে আমার। আমি এভাবেই খেলতে অভ্যস্ত’। ট্রফি হাতছাড়া হলেও, ক্রিকেটবোদ্ধারা মনে করছেন আইপিএলের এই মঞ্চ থেকেই বিশ্বক্রিকেট পেয়ে গেল আগামী দিনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।