ফুটবল মাঠে জয় এল দীর্ঘ ছয় বছর পর, কিন্তু সেই আনন্দ বিষাদে রূপ নিতে সময় লাগল না কয়েক ঘণ্টা। এসোয়াতিনিকে হারিয়ে আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের মূল বাছাইপর্বে জায়গা করে নিয়েছিল ইরিত্রিয়া। কিন্তু সেই ইতিহাস গড়া জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো আসল নাটক।
জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় যাত্রাবিরতির সময় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন দলের সাতজন প্রধান ফুটবলার। আর এই নজিরবিহীন ঘটনায় এখন হুমকির মুখে ইরিত্রিয়ার ফুটবল ভবিষ্যৎ।
গল্পটা শুরু হয়েছিল ৩১ মার্চ। এসোয়াতিনির মাঠে ৪-১ অ্যাগ্রিগেটে দাপুটে জয় পায় ইরিত্রিয়া। কিন্তু ফেরার পথে যখন দলটি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে কায়রো পৌঁছাল, দেখা গেল ২৪ সদস্যের স্কোয়াড থেকে সাতজন ফুটবলার গায়েব! নিখোঁজ হওয়া এই খেলোয়াড়দের সবাই ইরিত্রিয়ার স্থানীয় ফুটবলার।
দলের ১০ স্থানীয় খেলোয়াড়ের মধ্যে ৩ জন দেশে ফিরেছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন দুই গোলরক্ষক কিব্রম সোলোমান ও আওয়েত মাহেরিনা, তিন ডিফেন্ডার এবং অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মেধান রেডিয়ে।
ইরিত্রিয়ার ফুটবলারদের এভাবে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত ২০ বছরে দেশটির প্রায় ৮০ জন ফুটবলার, কোচ ও কর্মকর্তা বিদেশের মাটিতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। এর নেপথ্যে রয়েছে দেশটির অত্যন্ত কঠোর ও বিতর্কিত শাসনব্যবস্থা।
দীর্ঘমেয়াদী বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং নাগরিক স্বাধীনতার অভাব ফুটবলারদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কেনিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা ও বতসোয়ানাতেও একইভাবে দলবেঁধে পালিয়েছিলেন ইরিত্রিয়ার ফুটবলাররা।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, গত ছয় বছর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেলেই এবার আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের প্রিলিমিনারি রাউন্ডে বাজিমাত করেছিল ইরিত্রিয়া। মিশরীয় কোচ হেশাম ইয়াকানের অধীনে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও জার্মানির লিগে খেলা প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে এক শক্তিশালী দল গড়েছিলেন তারা। কিন্তু জয়ের পরপরই স্থানীয় ফুটবলারদের এই পলায়ন পুরো অর্জনকেই যেন ম্লান করে দিয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ২০২৭ সালের কাপ অফ নেশনসের মূল বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যেখানে বড় বড় দলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল ইরিত্রিয়া। কিন্তু অর্ধেকের বেশি স্থানীয় খেলোয়াড় হারিয়ে এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবল এই ঘটনাকে 'রহস্যময়' বলে অভিহিত করেছে।
নিজের দেশের ভেতরেই যারা 'বন্দী' অনুভব করেন, তাদের কাছে ফুটবল হয়তো কেবল একটি খেলা নয়, বরং বিদেশের মাটিতে স্বাধীনতার দরজা খোলার একটি পাসপোর্টের নাম। ইরিত্রিয়ার এই সাত ফুটবলারের পলায়ন সেই রূঢ় সত্যটিই আবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা