২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র যখন যৌথ আয়োজক হিসেবে নাম লেখাল, তখন বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মনে ছিল একরাশ সংশয় ও নেতিবাচকতা। আমেরিকার কঠোর ভিসা নীতি, আকাশছোঁয়া খরচ, বন্দুক সহিংসতা কিংবা সকার বা ফুটবলের প্রতি স্থানীয় মার্কিনিদের অনাগ্রহের মতো বিষয়গুলো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন আন্তর্জাতিক পর্যটকরা।
তবে মাঠের লড়াই শুরু হতেই সেই সব মেঘ যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বুঁদ হয়ে আছে বিদেশি ফুটবল ভক্তদের মার্কিন প্রশংসায়। ২৪ ঘণ্টার শপিং মল, সোডায় ফ্রি রিফিল, র্যাঞ্চ ড্রেসিংয়ে চুবানো চিকেন উইংসের স্বাদ আর সর্বোপরি সাধারণ মার্কিনিদের আন্তরিক আতিথেয়তায় মুগ্ধ হচ্ছেন প্রথমবার আমেরিকায় পা রাখা ফুটবলপ্রেমীরা।

বস্টনের একটি পাবে হাইতির বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে আড্ডায় মেতেছিলেন স্কটল্যান্ডের ‘টার্টান আর্মি’ সমর্থক গেইল নিচল। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, সেখানে বস্টনের দুটি দারুণ মেয়ের সাথে আমার আলাপ হয়। তাদের একজনের জন্মদিন উপলক্ষে ককটেল খাচ্ছিল। আমি তাদের আরও একটি ককটেল উপহার দিতে তারা সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল, ‘বস্টন, ম্যাসাচুসেটসে তোমাকে স্বাগতম!’ তারা আমাদের ভালোবেসে ফেলেছে, আমরাও তাদের। এখানকার সবাই ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ ও চমৎকার। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ থেকে আসা এক সুইস ভক্তও জনপ্রিয় ফোরাম রেডিটে মার্কিনদের এই অমায়িক ও খোলামেলা স্বভাবের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টরপন্থী সরকার যখন কানাডা, ব্রিটেন বা জার্মানির মতো পরম মিত্রদেরও চটিয়েছিল, তখন ফুটবলের এই ইতিবাচক হাওয়া আমেরিকার ড্যামেজ হওয়া ইমেজ পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখছে।
আলাবামার স্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ডারিন হোয়াইট বলেন, একটি বাড়ির সদর দরজা যেমন ভেতরের পরিবেশের আভাস দেয়, খেলাধুলাও একটি শহর বা দেশের জন্য সেই একই কাজ করে। এটি মানুষের মনে এমন এক আবেগপূর্ণ ইতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়, যা তারা আগে কখনো ভাবেনি। বিভিন্ন গবেষণাও বলছে, বড় কোনো ক্রীড়া উৎসব দীর্ঘদিনের চেনা সামাজিক কুসংস্কার বা স্টেরিওটাইপকে নিমিষেই ভেঙে দিতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, পর্যটকরা শুধু নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস বা অরল্যান্ডোর মতো চেনা জায়গাতেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা ছড়িয়ে পড়েছেন কানসাস সিটি, আটলান্টা কিংবা হিউস্টনের মতো একটু অফ-বিট শহরেও। কানসাস সিটিতে জড়ো হওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকরা, যাদের কাছে ফুটবল আর ‘আসাদো’ (কয়লার আগুনে পোড়ানো বারবিকিউ) সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, তারা মার্কিনদের নিজস্ব ‘ড্রাই রাব’ স্টাইলের গ্রিলড মাংসের স্বাদ নিয়ে রীতিমতো ফিদা!
ক্রিস্টিয়ান গ্যাস্টেস নামের এক আর্জেন্টাইন সমর্থক তো বলেই দিলেন, আর্জেন্টাইন বারবিকিউ আমার সবচেয়ে প্রিয় হলেও, কানসাসের এই মাংসের স্বাদ সত্যিই দুর্দান্ত। ওদিকে ডালাসে জার্মানির ফ্যান ম্যাক্সিমিলিয়ান কির্চ টেক্সান কাউবয় হ্যাট মাথায় চড়িয়ে বারবিকিউর স্বাদ নিচ্ছেন এবং মার্কিন সংস্কৃতির আরও গভীরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
অবশ্য টুর্নামেন্টকে ঘিরে কিছু উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। মিয়ামির মতো শহরগুলোর তীব্র গরম খেলোয়াড় ও দর্শক উভয়ের জন্যই বেশ কষ্টদায়ক হয়ে উঠছে, অথচ ফাইনাল ম্যাচ এখনো এক মাস বাকি! এছাড়া টিকিটের চড়া মূল্য ও যাতায়াত খরচের কারণে অনেক সাধারণ ভক্তই মাঠে আসতে পারেননি। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইরানের মতো মুসলিম দেশ এবং হাইতি, আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের মতো আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ বা আংশিক মার্কিন প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে।

তিউনিসিয়া বা সেনেগালের ভক্তরা যখন নিজ দেশে বসে টিভিতে ম্যাচ দেখতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন আমেরিকার মাঠগুলোতে প্রবাসীরাই তাদের বড় ভরসা। নিউ জার্সিতে ফ্রান্স বনাম সেনেগালের ম্যাচে গ্যালারির উঁচুতে বসে সেনেগালের জার্সি গায়ে গলা ফাটাচ্ছিলেন ব্রুকলিনের কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দা জেসিকা অ্যাম্ব্রেস। তিনি জানান, আফ্রিকান ডায়াসপোরা বা সংস্কৃতির প্রতি টান থেকেই তিনি সেনেগালকে সমর্থন করছেন। স্টেডিয়ামগুলোতে মার্কিনিরা শুধু নিজেদের দেশ বা পূর্বপুরুষের দেশকেই সমর্থন করছেন না, বরং আন্ডারডগ ও যেসব দেশের সমর্থক কম, তাদের হয়েও গলা ফাটাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজার পরও মার্কিন আতিথেয়তার এই উষ্ণতা যেন বিদেশি ভক্তদের মনে দাগ কেটে থাকে, সেই আশাই করছেন দেশটির রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা। বস্টনের মেয়র মিশেল উ যেমন স্কটিশ টার্টান আর্মিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "ম্যাচ চলাকালীন তো বটেই, বিশ্বকাপের পরেও যেকোনো ঋতুতে, যেকোনো বছরে আপনারা বস্টনে ফিরে আসুন। মনে রাখবেন, এটি আপনাদেরই ঘর।" মাঠের উত্তাপের পাশাপাশি আমেরিকার এই ভালোবাসার ‘সকার ডিপ্লোমেসি’ যে ব্র্যান্ড ইউএসএ’র গ্রাফকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
