বিশ্বকাপের আগেই কি উরুগুয়ের ড্রেসিংরুম ধ্বংস করছেন বিয়েলসা?

ফুটবল দুনিয়ায় তিনি একাধারে পূজনীয় গুরু এবং খ্যাপাটে পাগল। মার্সেলো বিয়েলসা, ফুটবল কোচিংয়ের এক অবিসংবাদিত পথপ্রদর্শক, যাঁর আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শন অনুপ্রাণিত করেছে পেপ গুয়ার্দিওলা কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বস মাউরিসিও পচেত্তিনোর মতো আধুনিক যুগের সেরা কোচদের।

কিন্তু সেই ৭০ বছর বয়সী ‘এল লোকো’র (যার অর্থ উন্মাদ বা পাগল) অতিরিক্ত খামখেয়ালিপনা আর অদ্ভুত সব পদ্ধতি কি এবার উরুগুয়ের বিশ্বকাপ স্বপ্নকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ভেস্তে দিচ্ছে! ড্রেসিংরুমের অন্দরমহল থেকে ভেসে আসা চাপা ক্ষোভ আর গুঞ্জন কিন্তু সেই আশঙ্কাই জাগিয়ে তুলছে।

উরুগুয়ের কোচ হিসেবে বিয়েলসার আগমনটা ছিল রাজকীয়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শুরুতেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা এবং পরাশক্তি ব্রাজিলকে হারিয়ে উরুগুয়ের ফুটবল ভক্তদের মনে এক বিশাল উন্মাদনা তৈরি করেন এই আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু সেই উড়ন্ত শুরুর রেশ ধরে রাখতে পারেনি উরুগুয়ে। বাছাই পর্বের শেষ ১২টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটিতে জয় পেয়ে বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে হয়েছে তাদের।

খেলোয়াড়দের সাথে বিয়েলসার সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায়। উরুগুয়ে টুর্নামেন্টে ব্রাজিলকে বিদায় করে তৃতীয় স্থান অর্জন করলেও, পুরো এক মাস ধরে বিয়েলসার মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা ও মানসিক চাপ খেলোয়াড়রা একদমই ভালোভাবে নেননি।

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর উরুগুয়ের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ বিয়েলসার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ক্ষোভ উগরে দেন। সুয়ারেজ দাবি করেন, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ২-০ গোলে জেতা একটি ম্যাচের হাফ-টাইমে বিয়েলসার নির্মম ও তীব্র সমালোচনার মুখে ড্রেসিংরুমে কেঁদে ফেলেছিলেন নুনেস! সুয়ারেজের এই হাটে হাঁড়ি ভাঙার পর বিয়েলসা নিজেও স্বীকার করতে বাধ্য হন, ড্রেসিংরুমে উরুগুয়ের বাকি ফুটবলারদের সামনে তাঁর কর্তৃত্ব ও ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

শুধু সম্পর্কের ফাটলই নয়, মাঠের পারফরম্যান্সেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রীতি ম্যাচে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিয়েলসা নিজেই মিডিয়ার সামনে বলেছিলেন, তিনি লজ্জিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিয়ামি এবং গুয়াদালাহারার মতো চরম প্রতিকূল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায়, যেখানে গ্রুপ 'এফ'-এ উরুগুয়েকে লড়তে হবে সৌদি আরব, কেপ ভার্দে এবং স্পেনের বিরুদ্ধে, সেখানে বিয়েলসার এই অতি-উচ্চ শক্তির ফুটবল স্টাইল উরুগুয়ের ফুটবলাররা কতটা নিতে পারবেন? যেখানে খেলোয়াড়রা কোচের ওপর থেকে ইতিমধ্যেই আস্থা হারাতে শুরু করেছেন।

অথচ এই বিয়েলসার ফুটবল জ্ঞানকে বিশ্বজুড়ে ‘জাদুকরী’ মনে করা হয়। তাঁর নামে আর্জেন্টিনার নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবের স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয়। বিয়েলসার হাত ধরে ১৩ বছর বয়সে ফুটবলে আসা বর্তমান মার্কিন কোচ পচেত্তিনো তাঁকে একজন ‘জিনিয়াস’ এবং অনন্য ক্যারিশমার অধিকারী হিসেবে গণ্য করেন।

অন্যদিকে ম্যান সিটির সদ্য সাবেক বস পেপ গার্দিওলা কোচিং ক্যারিয়ার শুরুর আগে বিয়েলসার পরামর্শ নিতে আর্জেন্টিনায় ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর মতে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা প্রিমিয়ার লিগ জেতার চেয়েও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া বড় খেতাব, আর মার্সেলোর তা বিশ্বের যে কোনো ম্যানেজারের চেয়ে বেশি আছে।

কিন্তু বিয়েলসার ট্র্যাক রেকর্ড বলছে অন্য কথা। অ্যাথলেটিক বিলবাও বা অলিম্পিক মার্সেই, সব জায়গাতেই তাঁর দল শুরুতে উড়ন্ত ফুটবল খেললেও, টুর্নামেন্টের শেষভাগে এসে খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে পুরোপুরি নিঙড়ে নিঃশেষ হয়ে যেতেন এবং শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরতেন।

ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডকে ১৬ বছর পর প্রিমিয়ার লিগে ফিরিয়ে এনে তিনি এখনো সেখানকার দেয়ালে দেয়ালে ম্যুরাল হয়ে আছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিদায়ের পরের মরসুমেই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত লিডস রেলিগেশনের মুখে পড়েছিল। এমনকি এর আগে ২০০২ সালে আর্জেন্টিনা এবং ২০১৪ সালে চিলির কোচ হিসেবেও বিশ্বকাপে বিয়েলসার রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়।

আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলতে যাওয়া এই বিশ্বকাপের পর বিয়েলসা, উরুগুয়ের ড্রেসিংরুমে আর থাকছেন না, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত তিনি নিজেই দিয়ে দিয়েছেন। গত শুক্রবার উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে বিয়েলসা জানান, বিশ্বকাপের সাথেই আমাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ।

উরুগুয়ের স্থানীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, জুনের এই আসর শেষেই উরুগুয়ে অধ্যায়ের ইতি টানবেন তিনি। তবে যাওয়ার আগে ড্রেসিংরুমের এই চরম অসন্তোষের আগুন নিভিয়ে, খেলোয়াড়দের মন জয় করে বিয়েলসা উরুগুয়েকে বিশ্বকাপে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন, সেটাই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চকর দেখার বিষয়!