মেক্সিকোর অলিগলিতে ফুটবলের নান্দনিক রূপকথা

উত্তর আমেরিকায় যখন বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, তখন সহ-স্বাগতিক মেক্সিকোর প্রতিটি কোণে কোণে বইছে এক অদ্ভুত ফুটবলীয় উন্মাদনা। মেক্সিকোর মানুষ ফুটবল খেলার জন্য কোনো আলিশান স্টেডিয়ামের অপেক্ষা করে না; সম্প্রদায়গুলো যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা পায়, সেখানেই বুক পকেট থেকে বের করে আনে ফুটবল।

শহরের শেষ সীমানায় ধূলিময় পথ, হাইওয়ের আন্ডারপাস, প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার কচ্ছপ-খাল, এমনকি একটি মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখও আজ মেক্সিকানদের পায়ের জাদুতে হয়ে উঠেছে একেকটি ফুটবল মঞ্চ! যেখানে ধনী-দরিদ্র, তরুণ থেকে বৃদ্ধ, সবাই মেক্সিকোর ফুটবল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন।

Mexico Football 02
রয়টার্সের আলোকচিত্রী রাকেল কুনহা দীর্ঘ তিন মাস ধরে ড্রোন এবং ক্যামেরার সাহায্যে মেক্সিকোর অলিগলিতে অপেশাদার ফুটবলের এই বৈচিত্র্যময় ও নান্দনিক রূপগুলোকে বন্দি করেছেন। তাঁর সেই চোখ জুড়ানো ফ্রেমগুলো থেকেই উঠে এসেছে মেক্সিকানদের ফুটবল প্রেমের অবিশ্বাস্য কিছু বাস্তব চিত্র।

মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে গ্রামীণ এক এলাকায় অবস্থিত ‘তিওকা আগ্নেয়গিরি’। বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই আগ্নেয়গিরির ঠিক জ্বালামুখের ভেতর গড়ে তোলা হয়েছে একটি ফুটবল পিচ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিল্ড অব দ্য গডস’ বা দেবতাদের মাঠ।

Mexico Football 02
প্রায় ৬০ বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০ মিটার উঁচুতে মাঠটি তৈরি করেছিলেন। প্রতি রোববার কুয়াশাঘেরা পাইন গাছ আর ফলের বাগানে ঘেরা এই জ্বালামুখে পরিবার নিয়ে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে বা বাইকে চড়ে হাজার হাজার মানুষ আসেন স্থানীয় অপেশাদার দলগুলোর ম্যাচ দেখতে।

এর থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে জাতিসংঘের ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট ‘শোচিমিলকো’। সেখানে ফুটবলাররা প্রাচীন অ্যাজটেক আমলের ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকায় (‘ত্রাজিনেরা’) চড়ে খাল পার হয়ে খেলতে যান প্রাচীন ভাসমান বাগান বা ‘চিনাম্পা’র মাঠে।

Mexico Football 04
মেক্সিকো সিটির অবশিষ্ট থাকা প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠগুলোর মধ্যে এগুলো অন্যতম। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই অনন্য জলাভূমিতে ফুটবল খেলার মাঠ তৈরির কারণে বিলুপ্তপ্রায় ‘অ্যাক্সোলটল স্যালামান্ডার’ (এক ধরণের উভচর প্রাণী)-এর প্রাকৃতিক বাসস্থান ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

অন্যদিকে, উত্তরের শিল্প শহর মন্তেরেই-এর এক দরিদ্রতম পাড়ায় ভাঙাচোরা গাড়ি আর ধুলোবালির মাঝে গড়ে উঠেছে একটি জরাজীর্ণ মাঠ। সেখানে ১৪ বছর বয়সী উমবার্তো গুয়াদালুপে নামের এক কিশোর দিনরাত ফুটবল পায়ে মকশো করে। ফুটবলপ্রেমী পরিবার আর বন্ধুরা তাকে ডাকে ‘মেসি’ বলে। তার দাদীর অনুপ্রেরণায় সেও একদিন আর্জেন্টিনার মেসির মতো বিশ্ব কাঁপানোর স্বপ্ন দেখে। কিশোর মেসি বলে, আমরা ম্যাচ হারলেও মাথা কখনো নিচু করি না, একদিন না একদিন স্বপ্ন সত্যি হবেই।

Mexico Football 0
দূরত্ব, দারিদ্র্য কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ, মেক্সিকোর মানুষকে ফুটবল থেকে দূরে রাখতে পারেনি। প্রতিকূল পরিবেশ জয় করে মেক্সিকানরা ফুটবলকে যেভাবে নিজেদের জীবন ও সংস্কৃতির সাথে মিশিয়ে নিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে তা সারাবিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক পাক্ষিক অনুপ্রেরণার গল্প।