ব্রাজিলের এবার ‘হয় এসপার, নয় ওসপার’

ব্রাজিল ফুটবল দলের বর্তমান স্কোয়াডের দুই তরুণ ফুটবলার যখন জন্মও নেননি, তখন শেষবারের মতো ২০০২ সালে ফিফা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখেছিল সেলেসাওরা। ব্রাজিলের এক পুরো প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে যারা নিজেদের দেশকে বিশ্বসেরা হতে দেখেনি।

সে দেশে ফুটবল মানে শুধু জয়-পরাজয় নয়, ফুটবল খেলার নান্দনিক শৈলী আর ছন্দই আসল। পেলের ১৯৭০ বা মারাদোনার যুগের ১৯৮৬ সালের মতো ফুটবল আজকের দল থেকে আশা করা বোকামি হলেও, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গ্ল্যামার আর ঐতিহ্যেরক্ষার জন্য এবারের বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ‘হয় এসপার, নয় ওসপার’ এক লড়াই।

Brazil 08
দীর্ঘ ২৪ বছর পর ছক্কা হাঁকিয়ে ষষ্ঠ ট্রফি ঘরে তুলতে মরিয়া ব্রাজিল তাদের ডাগআউটে বসিয়েছে ঝানু ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তিকে, যাঁর সাথে চুক্তি করা হয়েছে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। তবে এই মিশন সফল করতে আনচেলত্তিকে এগোতে হচ্ছে এক চরম বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ধরে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রদ্রিগো, এস্তেইভাও এবং এদের মিলিতাওয়ের মতো তিন মূল তারকাকে চোটের কারণে হারিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন আনচেলত্তি। এরপর প্রীতি ম্যাচগুলোতে দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। পানামার বিপক্ষে ৬-২ গোলের বড় জয় পেলেও প্রথমার্ধে ৪ জন ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলার কৌশল চরমভাবে ফ্লপ মারে।

Brazil Team 2
মাঝমাঠে মাত্র দুজনকে রাখায় ৩৪ বছর বয়সী ক্যাসেমিরো এবং ব্রুনো গুইমারেসকে নাচিয়ে ছেড়েছে পানামার ফুটবলাররা। দ্বিতীয়ার্ধে তিন মিডফিল্ডার নামানোর পর ব্রাজিল ছন্দে ফেরে। এরপর মিশরের বিরুদ্ধে ২-১ গোলে জেতার ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন রাইট-ব্যাক ওয়েসলি।

বাধ্য হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাওয়া মিডফিল্ডার এদেরসনকে দলে ডাকেন আনচেলত্তি। ফলে মাঝমাঠের শক্তি বাড়লেও রাইট-ব্যাক পজিশন নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম শূন্যতা। শনিবার মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে দানিলো নাকি রজার ইবানেজ কে খেলবেন, তা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমের কপালে।

Brazil Team 5
সবচেয়ে বড় চমক ও নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে ব্রাজিলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে। ৩৪ বছর বয়সী নেইমারের বর্তমান ফর্ম যেমন আহামরি কিছু নয়, তেমনই ২০২৩ সালের অক্টোবরের মারাত্মক হাঁটুর চোটের পর তাঁর পায়ে আগের সেই ধার কতটা আছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এমনকি স্কোয়াড ঘোষণার পরও ডান পায়ের পেশির চোটের কারণে তিনি কেবল রিহ্যাবই করে গেছেন, মাঠে নামার মতো ফিট এখনও নন। অথচ আনচেলত্তি নিজেই আগে বলেছিলেন, কোনো চোটাক্রান্ত খেলোয়াড়কে তিনি নেবেন না। তাহলে কেন নেইমারকে নিয়ে এই অবিশ্বাস্য ঝুঁকি নিলেন কোচ?

Brazil Team 01
এর পেছনে লুকিয়ে আছে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের এক ঐতিহাসিক টনিক। সেবার ইতালির সহকারী কোচ ছিলেন আনচেলত্তি। টুর্নামেন্টের শুরুতে ইতালির রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ফ্রাঙ্কো বারেসি হাঁটুর চোটে পড়ে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। সবাই ভেবেছিল বারেসির বিশ্বকাপ শেষ।

কিন্তু ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে অলৌকিকভাবে মাঠে নেমে ব্রাজিলের সেরা স্ট্রাইকার রোমারিওকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন বারেসি। তীব্র গরম আর এক মাসের ক্লান্তির পর ফাইনালে দেখা গিয়েছিল, ক্লান্ত খেলোয়াড়দের চেয়ে ইনজুরি কাটিয়ে ফ্রেস হয়ে আসা খেলোয়াড় অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেন।

Brazil Carlo Ancelloti 02
আনচেলত্তিও নেইমারকে নিয়ে ঠিক একই অংক কষেছেন। টুর্নামেন্টের শেষের দিকে যখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা এক মাসের ফুটবল খেলে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, ঠিক তখন সুপার-সাব বা ট্রাম্প কার্ড হিসেবে সম্পূর্ণ ফ্রেস নেইমারকে মাঠে নামিয়ে ম্যাজিক দেখাতে চান আনচেলত্তি। ২৬ জনের স্কোয়াডে নেইমারের মতো একজন জাদুকরকে রাখা এই কারণেই সার্থক মনে করেছেন তিনি।

আলিসন, মার্কিনহোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, ক্যাসেমিরো, ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও রাফিনহাকে নিয়ে গড়া ব্রাজিলের মূল একাদশ বেশ শক্তিশালী হলেও, দুই প্রান্তের রক্ষণভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতা কিংবা আক্রমণভাগে এন্দ্রিক বা মাথেউস কুনিয়ার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে শান্ত স্বভাবের আনচেলত্তি এসব নিয়ে ভাবছেন না।

২৪ বছরের ট্রফি খরা কাটাতে নেইমারকে নিয়ে খেলা এই মহা জুয়া শেষ পর্যন্ত মারাকানার দেশটিকে ষষ্ঠ স্বর্গ এনে দেয়, নাকি চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।