সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ জয়ের পাশাপাশি ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট বগলদাবা করেছেন হ্যারি কেইন। ৫১ ম্যাচে ৬১ গোলের এক অবাস্তব পরিসংখ্যান নিয়ে বিশ্বকাপে পা রেখেই নিজের জাত চিনিয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচেই জোড়া গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৮০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। একই সাথে কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন কেইনই।
তবে কেইনের এই অতিমানবীয় ‘গোলমেশিন’ হয়ে ওঠার পেছনে মাঠের কৌশলের চেয়েও বড় অবদান রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক অদ্ভুত ও নিখাদ স্থিতিশীলতার। তিনি আর কেউ নন, কেইনের স্কুলজীবনের প্রেমিকা এবং তাঁর চার সন্তানের মা কেটি গুডল্যান্ড।
হ্যারি কেইন এবং কেটি গুডল্যান্ডের প্রেমের গল্পটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। উত্তর-পূর্ব লন্ডনের চিংফোর্ড ফাউন্ডেশন স্কুলে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন তাঁরা, উল্লেখ্য, এটি সেই একই স্কুল যেখানে এক সময় পড়েছিলেন ফুটবলের পোস্টার বয় ডেভিড বেকহ্যাম।
২০০৫ সালের এক ঐতিহাসিক ছবি আজও নেটদুনিয়ায় ঘুরে বেড়ায়, যেখানে মাত্র ১১ বছর বয়সী কেইন এবং কেটি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছেন বেকহ্যামের ফুটবল একাডেমির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। কে জানত, সেই শৈশবের ছবিটাই একদিন বিশ্বফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী এক জুটির গল্প লিখবে! ১৬ বছর বয়স থেকে অফিশিয়ালি ডেটিং শুরু করা এই জুটি গ্ল্যামার দুনিয়ার আলো থেকে নিজেদের সব সময় দূরেই রেখেছেন। কেইন এক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন, আমরা একসাথে পড়াশোনা করেছি, তাই আমার ক্যারিয়ারের শূন্য থেকে আজ এই চূড়ায় পৌঁছানো, সবকিছুর সাক্ষী ও।
২০১৭ সালের ১ জুলাই বাহামা দ্বীপে এক রোমান্টিক ছুটির দিনে কেটিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন কেইন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেইনের সেই ছোট ঘোষণা, শি সেইড ইয়েস (সে হ্যাঁ বলেছে), সেই সময়ে বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। ২০১৯ সালে এক জাঁকজমকপূর্ণ ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। বর্তমানে এই দম্পতির ঘরে রয়েছে চার সন্তান: আইভি জেন, ভিভিয়েন জেন, লুইস হ্যারি এবং হেনরি এডওয়ার্ড।
অনেক ফুটবলারের স্ত্রী যেখানে মডেল বা ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে লাইমলাইটে থাকতে পছন্দ করেন, স্পোর্টস সায়েন্সে ডিগ্রিধারী কেটি সেখানে একেবারেই প্রচারবিমুখ। কেইনের এই আকাশছোঁয়া খ্যাতিকে তিনি শুধুই একটু পাগলামি বলেই মনে করেন।
কেইনের ভাষায়, আমি যদি এখন সিঙ্গেল হতাম, তবে কখনোই বুঝতে পারতাম না কে আমার টাকার জন্য আসছে আর কে ভালোবাসার জন্য। আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে আমার পাশে আমার শৈশবের ভালোবাসা রয়েছে। ২০২৩ সালে যখন টটেনহ্যাম ছেড়ে কেইন বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন, তখন জার্মানিতে মানিয়ে নিতে কেটিই ছিলেন তাঁর আসল শক্তির উৎস।
মিউনিখের ঐতিহ্যবাহী অক্টোবর উৎসবে অংশ নিয়ে বাভারিয়ান সংস্কৃতির সাথে পুরো পরিবারকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা গেছে কেইনের মাঠের পারফরম্যান্সে।
বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী হ্যারি কেইন তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থেকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলছেন। থমাস টুখেল তাঁর ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে অনেক বড় বড় তারকাকে ছেঁটে ফেললেও, বায়ার্ন মিউনিখে গোলবন্যা বইয়ে দেওয়া কেইনের ওপরই পুরো ব্রিটিশদের ভরসা।
১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড আর কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি। কেইনের দুর্দান্ত ফর্ম আর মাঠের পেছনের পারিবারিক শান্তি কি পারবে ইংল্যান্ডের দীর্ঘ ৬০ বছরের ট্রফি খরা ঘোচাতে? কেটি গুডল্যান্ডের শান্ত ও অবিচল সমর্থনকে সঙ্গী করে কেইন বিশ্বজয়ের ইতিহাস লিখতে পারেন কিনা, সেটাই সময়ই বলে দেবে।