৫০ হাজার থেকে ভোজিনহার এখন দেড় কোটি ফলোয়ার!

২০২৬ বিশ্বকাপে নবাগত দেশ কেপ ভার্দের হয়ে যখন তিনি প্রথমবার মাঠে নামলেন, বিশ্বফুটবল তাঁর নামই জানত না। অথচ আজ ফুটবল দুনিয়া এমন এক চরিত্রের প্রেমে পড়েছে, যিনি টুর্নামেন্টে নিজের দলের ভাগ্য যাই হোক না কেন, ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা লোকগাথা হয়ে গেছেন।

ফুটবলপ্রেমীরা আদর করে তাঁকে ডাকছেন ‘লিটল গ্র্যান্ডমা’! আর এই ‘নানী’ আর কেউ নন, তিনি কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ভোজিনহা। ব্রাজিলের সাবেক তারকা জোসিমারের নামানুসারে আসল নাম জোসিমার রাখা হলেও, এই বুড়ো বয়সে এসে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে স্পেনের বিশ্বখ্যাত আক্রমণভাগকে একাই রুখে দিয়ে (০-০ ড্র) রাতারাতি বিশ্বমঞ্চের লাইমলাইটে চলে এসেছেন তিনি।
Vozinha 01
স্পেনের বিরুদ্ধে সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর ভোজিনহার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলেও যেন সুনামি বয়ে গেছে। বিশ্বকাপে নামার আগে ইনস্টাগ্রামে যাঁর ফলোয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ হাজার, সেই বুড়ো ভোজিনহার ফলোয়ার সংখ্যা এখন রকেট গতিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে!

তবে মাঠের এই আকাশচুম্বী সাফল্য আর খ্যাতির আলো মোটেও অন্ধ করতে পারছে না এই সরল মানুষটিকে। কেপ ভার্দের ক্লাব ‘স্পোর্ট ক্লাব আফ্রিকা শো’-তে খেলা তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু টনি সিলভা ভোজিনহার এই মাটির মানুষ হওয়ার গল্প শুনিয়ে বলেন, বিশ্বকাপে ও খেলছে, এটা আমাদের জন্য একটা স্বপ্নের মতো। ও এক্কেরে গরিব ঘর থেকে উঠে আসা ভীষণ বিনয়ী একটা ছেলে। এখনও পায়ে হাওয়াই চটি আর সাধারণ টি-শার্ট-শর্টস পরে বাচ্চাদের সাথে ধুলোমাটির মাঠে ফুটবল খেলে বেড়ায়। ওর কোনো অহংকার নেই। ২০১১ সালে লোকাল ক্লাব মিন্ডেলেন্সের হয়ে ভোজিনহার সাথে ট্রফি জেতা রাইট-ব্যাক নুনো পিরেসও সুর মিলিয়ে বলেন, ম্যাচ যত বড়ই হোক, ও সবসময় কুল আর রিল্যাক্সড থাকে। স্পেনের মতো বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে যখন ও মাঠে নামল, আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।

Vozinha 02
ভোজিনহার গোপন কথা ফাঁস করলেন ভাই:
 ভোজিনহাদের পুরো পরিবারের রক্তেই বইছে ফুটবল। তাঁর ছোট ভাই ডেলমিরো নাসিমেন্তো (৩৭) সাইপ্রাসের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব অ্যাকোতিরির হয়ে পেশাদার ডিফেন্ডার হিসেবে খেলছেন। বিশ্বমঞ্চে ভাইয়ের এই রাজকীয় উত্থানে ‘ডে’ (ডেলমিরোর ডাকনাম) যেমন আবেগে ভাসছেন, তেমনই ভাইদের চিরন্তন স্বভাব অনুযায়ী ভোজিনহার পেছনে লাগতেও ছাড়েননি।

হেসে কুটিপাটি হয়ে ডেলমিরো বলেন, ভাই হিসেবে ও একটা আস্ত পেইন, আক্ষরিক অর্থেই একটা পেইন! এই ইন্টারভিউ দেখলে ও নির্ঘাত আমাকে মারবে (হাসি)। তবে, ও পেইন এই অর্থে যে ও ভীষণ ডিমান্ডিং, সবাইকে সারাক্ষণ শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ হিসেবে ওর মনটা অনেক বড়।

Vozinha 03
আমেরিকার আটলান্টায় যখন কেপ ভার্দের জাতীয় সঙ্গীত বাজছিল এবং বড় ভাই ভোজিনহা শুরুর একাদশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই মুহূর্তের কথা মনে করে ডেলমিরোর চোখ ভিজে আসে। তিনি বলেন, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমাদের পুরো ইতিহাস, আমাদের লড়াই আর কষ্টগুলো তখন সার্থক মনে হচ্ছিল। ভাইয়ের এই ১.৫ কোটি ফলোয়ার হওয়ার পর ভোজিনহা বদলে যাবেন কি না, এমন প্রশ্নে ডেলমিরো শতভাগ নিশ্চিত করে বলেন, ও একটুও বদলাবে না, ওর পা সবসময় মাটিতেই থাকবে। ও ভীষণ স্পষ্টবাদী, মুখে যা আসে সরাসরি সামনে বলে দেয়। তবে হ্যাঁ, সুপারস্টার হওয়ার পর ওর এই ‘ঘ্যানঘ্যানে বা খিটখিটে’ স্বভাবটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, সেটা আমি নিশ্চিত (হাসি)!" ওদিকে জাতীয় দলের সতীর্থ ডেরয় দুয়ার্তে জানান, ভোজিনহার এই সাফল্যে পুরো স্কোয়াড ভীষণ আনন্দিত এবং এই পপুলারিটির কারণে দল মোটেও ফোকাস হারাচ্ছে না।

একদিনের মডেল ও মায়ের আঁচলে রাখা রত্ন: বিশ্বকাপের কল্যাণে আজ বিশ্বজুড়ে ভোজিনহা ঝড় উঠলেও, নিজের দেশ কেপ ভার্দেতে তিনি অনেক আগে থেকেই সুপারস্টার। বিশ্বকাপ শেষেই একাধিক বড় বড় ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপ, টিভি শো আর ইন্টারভিউয়ের লাইন লেগে গেলেও, ২০১৬ সালেই তিনি দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘রেভিস্টা সেম্প্রে ভিভা’-র কভার মডেল হয়েছিলেন।

Vozinha 05
সেই ম্যাগাজিনের মূল শিরোনাম ছিল, ‘আমরা সবাই ব্লু শার্কস’। ১০ বছর আগের সেই ম্যাগাজিনের কপি আর ভোজিনহার অটোগ্রাফ দেয়া পোস্টারটি নিজের ঘরে আগলে রেখেছেন ভোজিনহার মা আনা কান্দিদা এভোরো। একদিনের সেই মডেল আজ পুরো দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনন্য রোল মডেল।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিয়ে রূপকথা তৈরি করা ‘ব্লু শার্কস’রা ভোর ৪টায় মায়ামির মাঠে নামছে আরেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিরুদ্ধে। এরপর আগামী ২৬ জুন শুক্রবার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হিউস্টনে তারা মুখোমুখি হবে সৌদি আরবের। স্পেনের পর আজ উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ-ভালভার্দেদের আক্রমণভাগকেও ৪০ বছরের এই ‘লিটল গ্র্যান্ডমা’ গোলপোস্টের নিচে দেয়াল তুলে হতাশ করতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব!