ফুটবল দুনিয়ায় কেপ ভার্দে নামটা হয়তো উরুগুয়ের মতো ভারী নয়, কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে তারা যে কোনো পরাশক্তিকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারে, তা প্রথম ম্যাচেই টের পেয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। আসরের নবাগত দল হিসেবে খেলতে এসে ইউরোপসেরা স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে তারা। আর এই এক পয়েন্টই কেপ ভার্দের আত্মবিশ্বাসের পারদ আকাশচুম্বী করে তুলেছে।
এবার তাদের সামনে লাতিন আমেরিকার পাওয়ারহাউজ উরুগুয়ে। তবে উরুগুয়ের ঐতিহ্য বা তারকাদের নাম দেখে একদমই ভড়কে যাচ্ছে না আফ্রিকার এই পুঁচকে দলটি। উল্টো উরুগুয়েকে মাঠেই দেখে নেওয়ার প্রকাশ্য হুঙ্কার দিয়ে রেখেছেন কেপ ভার্দের ফুল-ব্যাক সিডনি লোপেস ক্যাব্রাল।

স্পেনের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত রক্ষণ আর গোলরক্ষক ভোজিনহার অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে ঐতিহাসিক ড্র ছিনিয়ে এনেছিল কেপ ভার্দে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের আর সেই ভাগ্য সহায় হবে না। কিন্তু ক্যাব্রাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা শুধু একটা ড্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে এখানে আসেননি, তাদের লক্ষ্য আরও অনেক বড়।
স্পেনের সাথে ড্র কি আপনাদের নকআউটের আশা বাড়িয়ে দিয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বেশ ঝাঁজালো গলায় ক্যাব্রাল বলেন, আশার কথা বলছেন? আমরা এখানে আসার আগেই আমাদের লক্ষ্য স্থির করে এসেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো গ্রুপ পর্ব পার করা। তাই স্পেনের বিপক্ষে এই ম্যাচটি আমাদের বাড়তি আশা দেয়নি, বরং আমাদের শক্তি এবং নিজেদের প্রতি বিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আমাদের যোগ্যতা খুব ভালো করেই জানি এবং মাঠে আমরা কী করতে পারি, সেটাও আমাদের জানা আছে।

অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচে স্পেনের এই পা হড়কানোর পুরো ফায়দা তোলার দারুণ সুযোগ ছিল উরুগুয়ের সামনে। কিন্তু মার্সেলো বিয়েলসার শিষ্যরা সেই সুযোগ হাতছাড়া তো করেছেই, উল্টো সৌদি আরবের মতো দলের বিরুদ্ধে কোনোমতে ১-১ গোলে ড্র করে মান বাঁচিয়েছে। ম্যাচের ৮০ মিনিটে ম্যাক্সি আরাউজোর গোলে হার এড়ালেও উরুগুয়ের মাঠের ফুটবল ছিল চরম হতাশাজনক।
বিশেষ করে আক্রমণভাগে ডারউইন নুনেজের অফ-ফর্ম উরুগুয়ে শিবিরে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সৌদি ম্যাচের এই ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সের পর কোচ বিয়েলসার ওপর এখন পাহাড়সম চাপ। যেহেতু গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হতে হবে শক্তিশালী স্পেনের, তাই কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে উরুগুয়ের ভুল করার বা পয়েন্ট হারানোর কোনো সুযোগই নেই। এখানে একটু এদিক-সেদিক হলেই গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের চরম লজ্জায় পড়তে পারে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দুই দলের কোনো শিবিরেই ইনজুরির কোনো চিন্তা নেই। তবে সৌদি ম্যাচে ডারউইন নুনেজের ব্যর্থতার পর বিয়েলসা আজ আক্রমণভাগে পরিবর্তন আনার ঝুঁকি নিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে উরুগুয়ে এবং কেপ ভার্দে এবারই প্রথম একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে। লাতিন আমেরিকার দলগুলোর বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের অতীত রেকর্ড অবশ্য ভালো নয়, আগের দুটি ম্যাচেই তারা হেরে মাঠ ছেড়েছিল।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে উরুগুয়ের রেকর্ড দুর্দান্ত; তাদের শেষ ৯টি গ্রুপ পর্বের ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১টিতে তারা হেরেছে। তবে এই ৯টি ম্যাচে গোল হয়েছে মাত্র ১৫টি, যা উরুগুয়ের রক্ষণাত্মক ও কম গোলের ম্যাচ খেলার প্রবণতাকে স্পষ্ট করে।

সাম্প্রতিক ফর্মের দিকে তাকালে উরুগুয়ে তাদের শেষ ৫টি ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি, বিপরীতে কেপ ভার্দে শেষ ৪টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, কেপ ভার্দে গত ৩১১ মিনিট ধরে কোনো গোল হজম করেনি! গত মার্চে ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তারা সর্বশেষ গোল খেয়েছিল, এরপর থেকে তাদের রক্ষণভাগ যেন আক্ষরিক অর্থেই এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। তবে আফ্রিকান দলগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে উরুগুয়ের রেকর্ড বেশ ভালো, ৫ ম্যাচের একটিতেও হারেনি তারা (৩ জয়, ২ ড্র)।
উরুগুয়ের সাম্প্রতিক ম্যাচের গোলখরা এবং কেপ ভার্দের ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগের ফর্ম বিবেচনায় নিলে বলাই যায়, আজ লাতিন আমেরিকার তারকাদের পকেটস্থ করতে ডিফেন্সের পেছনে বাজি ধরবে আফ্রিকার দলটি। উরুগুয়ে গোল করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে আক্রমণ চালালেও কেপ ভার্দের রক্ষণ ভাঙা চাট্টিখানি কথা হবে না। তবে ফুটবলের অভিজ্ঞতা আর শক্তিমত্তার বিচারে উরুগুয়ে শেষ পর্যন্ত একটা ফাঁক গলে গোল বের করে নিতে পারবে বলেই ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা। ম্যাচের কড়া প্রেডিকশন বলছে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে উরুগুয়ে ১-০ ব্যবধানে কষ্টার্জিত জয় পাবে।
