আর্জেন্টিনাকে হারানোর অনেক রসদ সুইসদের!

ভ্যাঙ্কুভারের সেই জাদুকরি রাতের পর পুরো সুইজারল্যান্ডে এখন শুধুই উৎসবের আমেজ। টাইব্রেকারে কলম্বিয়ার লাতিন সাম্বাকে স্তব্ধ করে দিয়ে পুরো ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে সুইস ‘নাটি’রা। ১৯৫৪ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে খেলা সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টারের স্মৃতি যেন ৭ দশক পর নতুন করে ফিরে এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।

তবে এবার সুইসদের সামনে আল্পস পর্বতের চেয়েও বিশাল এক চ্যালেঞ্জ, যেখানে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কানসাস সিটির ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর দমবন্ধ করা আর্দ্রতার নরকগুলজার আবহাওয়ায় এক রুদ্ধশ্বাস মহাযুদ্ধের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

Swiss Coach Murat Yakin 01
সুইসদের জন্য এই ম্যাচটি কেবল সেমিফাইনালের টিকিট কাটার লড়াই নয়, এটি আসলে ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই বুক চেরা কান্নার মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ। সেবার ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার কাছেই অতিরিক্ত সময়ের ১১৮ মিনিটের মাথায় একমাত্র গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল সুইজারল্যান্ড।

ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে ব্লেরিম জেমাইলির সেই জাদুকরী হেডটি যদি গোলপোস্টে লেগে ফিরে না আসত, তবে ফুটবল ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। সেই হারের ক্ষত এখনো মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন বর্তমান স্কোয়াডের দুই অভিজ্ঞ সেনানি গ্রানিত জাকা আর রিকার্দো রদ্রিগেজ। এবার তাঁদের সামনে এসেছে সেই অপমানের শোধ নেওয়ার মহিমান্বিত সুযোগ। অধিনায়ক জাকা হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ২০১৪ সালের হার আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছিল, সেবার আমরা প্রায় তাদের ধরে ফেলেছিলাম। এবার আর ভুল হবে না!

Swiss Team 03
মাঠের লড়াইয়ের বাইরে, সাইডলাইনে দাঁড়ানো সুইসদের প্রধান কোচ মুরাত ইয়াকিনকে নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হয়েছে তুমুল উন্মাদনা। নিজের স্টাইলিশ পোশাক, কাঁচাপাকা ধূসর চুল আর চশমার কারণে নেটিজেনরা তাঁকে ‘মায়ামি ইয়াকিন’ নামে ডাকছেন।

তবে ফ্যাশন নয়, ইয়াকিনের আসল শক্তি তাঁর খুনে রণকৌশল। কলম্বিয়া ম্যাচে পেনাল্টি ঠেকিয়ে রাতারাতি জাতীয় নায়ক বনে যাওয়া গ্রেগর কোবেল এখন গোলপোস্টের নিচে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। আর মাঝমাঠে জাকা ও রেমো ফ্রয়লারের জমাট রসায়ন প্রতিপক্ষের যেকোনো আক্রমণকে মাঝপথেই পিষে ফেলার মূল অস্ত্র। ম্যাচটির গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে স্ট্রাইকার ব্রিল এম্বোলো স্পষ্ট করেই বলেছেন, সম্ভবত এটি আমার, আমাদের দল এবং পুরো জাতির জন্য সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা হতে যাচ্ছে।

সুইসদের এই অদম্য আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া জোগাচ্ছে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের কঙ্কালসার অবস্থা। আলবিসেলেস্তেরা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও, এবারের টুর্নামেন্টে তারা অতি মাত্রায় ৩৯ বছর বয়সী বুড়ো লিওনেল মেসির ওপর নির্ভরশীল। মেসির ঝুলিতে ৮টি গোল থাকলেও, কেপ ভার্দে কিংবা মিসরের মতো দলের বিপক্ষে যেভাবে আর্জেন্টিনা ধুঁকে ধুঁকে জিতেছে, তা সুইসদের জন্য বড় এক সুযোগ তৈরি করেছে। দলের প্রাক্তন তারকা জেমাইলি যথার্থই খোঁচা দিয়ে বলেছেন, “আর্জেন্টিনার রয়েছে অসাধারণ কিছু একক তারকা, কিন্তু সুইজারল্যান্ডের আছে একটি সংগঠিত দল।

Swiss Team 01
পরিসংখ্যানও সুইসদের পক্ষে। ২০২২ বিশ্বকাপে পর্তুগালের কাছে সেই ভরাডুবির পর থেকে কোনো বড় আসরের নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সুইজারল্যান্ড কোনো ম্যাচ হারেনি, যা তাদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ। ১৯৫৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে শেষবার যখন তারা খেলেছিল, তখন লাউসানের সেই বিখ্যাত ‘হিট ব্যাটল’ ম্যাচে প্রচণ্ড গরমে অস্ট্রিয়ার কাছে ৭-৫ ব্যবধানে হেরে গোল বন্যায় ভেসে গিয়েছিল তারা।

সাত দশক পরে এসে আজ আবারও এক প্রতিকূল ও উত্তপ্ত আবহাওয়ায় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের। মুরাত ইয়াকিনের নিরেট রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা আর অধিনায়ক জাকার ইস্পাতকঠিন নেতৃত্ব কি পারবে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপের রথকে থামিয়ে দিতে? কানসাস সিটির উত্তপ্ত মাঠে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা জয়টি তুলে নিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করতে সুইজারল্যান্ড এখন পুরোপুরি প্রস্তুত!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স