আর্জেন্টিনা ফুটবল খেললেই ফিফা নাকি পকেট থেকে বাড়তি সুবিধা বের করে দেয়, ফুটবল বিশ্বকাপে এই গুঞ্জন এখন গ্যালারি থেকে সোশ্যালে হররাহামেশাই ভাসছে। আলবিসেলেস্তেদের একটু ভালো খেলতে দেখলেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের ভক্ত-সমর্থকরা বাঁকা হাসিতে খোঁচা মেরে বসেন, ‘সব ফিফার সেটিং!’
তবে মাঠের বাইরে চলা এই অন্তহীন ট্রোল আর অপবাদ নিয়ে এবার কানসাস সিটির সংবাদ সম্মেলনে এসে মুখ খুললেন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে মহাগুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালের আগে এমন ‘সুবিধা পাওয়ার’ তত্ত্বকে রীতিমতো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে স্কালোনি সোজা জানান, এই কানাকানি আজ নতুন নয়, গত ৪০ বছর ধরে তিনি একই ভাঙা রেকর্ড শুনে আসছেন!
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বাণ ধেয়ে আসতেই আর্জেন্টাইন বস টেনে এনেছেন ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যারাডোনা অধ্যায়। ‘হ্যান্ড অব গড’ নিয়ে আজও ফুটবল বিশ্বে যে তর্ক চলে, তার সূত্র ধরে স্কালোনি বলেন, ১৯৮৬ সালেও লোকে বলত আর্জেন্টিনা নাকি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। তাই এসব কথা আমাদের কান সয়ে গেছে। যতদূর মনে পড়ে, আর্জেন্টিনা সবসময়ই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল ছিল, আর শক্তিশালী দেখলেই মানুষের হিংসে হয়।
স্কালোনির মতে, যারা আর্জেন্টিনার সফলতা সহ্য করতে পারেন না, তারাই অহেতুক এসব ঈর্ষাকাতর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সহজ কথায়, দুনিয়ায় এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা চান না আর্জেন্টিনা জিতুক। আমাদের বেলায় হয়তো এমন মানুষের সংখ্যা একটু বেশি, আর আমরা সেটা জেনেই মাঠে নামি।
বাস্তবিক অর্থে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে সেই অবিশ্বাস্য ধাক্কার পর থেকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ আর্জেন্টিনাকে থামানোর সাধ্য কারও হয়নি। টানা ১১টি ম্যাচ জিতে তারা শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হয়নি, ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই অপরাজেয় তকমা ধরে রেখেছে।
গত বিশ্বকাপে ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করা বুড়ো লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সে এসেও এবারের বিশ্বকাপে ৮ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট করে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন একের পর এক বিশ্বরেকর্ড। স্কালোনির দাবি, এই বাইরের সমালোচনাই তাঁর ছেলেদের ভেতরে এক ধরণের জেদ আর বারুদ তৈরি করে, যা তাদের মাঠে আরও খুনে ফুটবল খেলতে উদ্বুদ্ধ করে।
তবে আর্জেন্টিনার এই কোয়ার্টার ফাইনালের পথটা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে আর শেষ ষোলোতে মিসর- দুটি ম্যাচই আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-২ গোলের নখকামড়ানো ব্যবধানে। বিশেষ করে গত ৭ জুলাই আটলান্টার মাঠে মিসরের বিরুদ্ধে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা! সেখান থেকে শেষ মুহূর্তের জাদুকরী নাটকে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টারের টিকিট কাটে তারা।
কিন্তু এই রূপকথার জয় ছাপিয়ে ম্যাচ শেষে ‘আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেওয়ার’ এবং ‘পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিংয়ের’ চড়া অভিযোগ তোলে মিসর। যদিও পরবর্তীতে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইগি কলিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মাঠে সবকিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।
ভিডিও রিপ্লে ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে রেফারিদের সহায়তায় ম্যাচ জেতার গল্পকে শুধুই হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিয়ে স্কালোনি বলেন, ফুটবলে অবান্তর দয়া বা সহায়তা বলে কিছু নেই। ২০২৬ সালে এসে এত এত ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রযুক্তির যুগে সেটা সম্ভবই নয়। নিয়ম সবার জন্য এক।
তবে মাঠের বিতর্ক এবার গড়িয়েছে সাইবার দুনিয়াতেও! মিসর ম্যাচে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খেপেছিলেন মিসরের কোচ হোসাম হাসান এবং ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো। আর সেই ক্ষোভ থেকে এবার আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে!
আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘লা ক্যালে’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মিসরীয় হ্যাকাররা আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে গণহারে ইমেইল পাঠাচ্ছেন।
সেই ইমেইলগুলোতে দাবি করা হচ্ছে- মিশরের নিশ্চিত জয় ‘দুর্নীতিগ্রস্ত রেফারিং সিদ্ধান্তের কারণে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে’। মাঠের লড়াই শুরুর আগে হ্যাকারদের এই আক্রমণ আর ব্রাজিলিয়ানদের লাগাতার ট্রোলের জবাব আজ কানসাসের উত্তপ্ত মাঠে মেসিরা বুট পায়ে দেন, নাকি মাঠের বাইরে স্কালোনির কথার বাণেই সুইজারল্যান্ড বধের নীল নকশা তৈরি হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!
তথ্যসূত্র: বেইন স্পোর্টস