দুই ‘এক্সট্রা টাইম’ থ্রিলারে অবিশ্বাস্য সব রেকর্ড!

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্বের শেষটা হলো চরম ড্রামা আর রোমাঞ্চে ভরপুর দুটি এক্সট্রা টাইমের (অতিরিক্ত সময়) থ্রিলার দিয়ে! মাঠের লড়াইয়ে জুড বেলিংহাম, হুলিয়ান আলভারেজ আর ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসিদের অতিমানবীয় শো-তে কুপোকাত হয়েছে প্রতিপক্ষরা।

ধীরগতির স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে সেমির টিকিট কেটেছে আর্জেন্টিনা। ১৯৯২ সালে ফিফা র‍্যাংকিং চালুর পর এবারই প্রথম টুর্নামেন্টের শীর্ষ চার বাছাই একসাথে সেমিফাইনালের টিকিট কাটল, যা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

Argentina Win 02
সুইসদের কাঁদিয়ে রেকর্ড বুক ওলটপালট করলেন মেসি:
আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্টের পসরা সাজিয়ে বসেন লিওনেল মেসি। পুরো ম্যাচে সতীর্থদের শট নেয়ার জন্য ২০টি পাস বাড়িয়েছেন এলএম১০। ১৯৬৬ সালের পর তিনিই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬) এই মাইলফলক স্পর্শ করলেন।

এছাড়া ম্যারাডোনাকে (৮ অ্যাসিস্ট) টপকে বিশ্বকাপে এখন মেসির অ্যাসিস্ট সংখ্যা ১০টি- যা গত ৬০ বছরে সর্বোচ্চ। ম্যাচের ১০ম মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে মেসির নেওয়া কর্নারটি ছিল তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের দ্রুততম অ্যাসিস্ট এবং কর্নার থেকে প্রথম অ্যাসিস্ট। এই গোলের আগ পর্যন্ত সুইসরা এবারের বিশ্বকাপ সাইকেলের ১১ ম্যাচে কখনো পিছিয়ে পড়েনি।

Argentina Win 04
বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচ পর মেসির গোল করার রেকর্ড ভাঙলেও, নক-আউট পর্বে ১৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখে এমবাপেকে (১৪) পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এছাড়া এমবাপের পর গত ৬০ বছরে একাধিক বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোলে অবদান রাখার কীর্তি গড়লেন মেসি।

আর্জেন্টিনা দল গড়ে ৩০ বছর ১৭৭ দিন বয়স নিয়ে ১৯৬২ সালের পর কোয়ার্টার ফাইনালের সবচেয়ে ‘বুড়ো’ দল হিসেবে মাঠে নামলেও তাদের তেজ ছিল দেখার মতো। টুর্নামেন্টের তৃতীয় খাটো দল হওয়া সত্ত্বেও কর্নার থেকে ৩টি গোল এবং সেট পিস থেকে ৫টি গোল করে তারা চমকে দিয়েছে সবাইকে।

Argentina Win 01
ম্যাচে হুলিয়ান আলভারেজ তাঁর ক্যারিয়ারের ৫ম বিশ্বকাপ গোলটি করে নক-আউটে গোল করার রেকর্ডে ম্যারাডোনার (৪ গোল) পাশে বসেছেন। আর অতিরিক্ত সময়ের ১২১তম মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজ আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের লেটেস্ট গোলটি করে ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।

এটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১৩তম অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচ (জার্মানির ১২ ম্যাচ টপকে সর্বোচ্চ), যার মধ্যে ১১টিতেই জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা। অন্যদিকে সুইস তারকা ব্রিল এমবোলো ডাইভিং বা ‘সিমুলেশন’-এর জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, যা গত ৬০ বছরে মাত্র চতুর্থ ঘটনা।

England Win 01
পেলের রেকর্ডে বেলিংহামের থাবা:
শনিবারের অন্য ম্যাচে নরওয়ের বিরুদ্ধে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে এক জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তারা পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতল, যা তাদের পুরো ফুটবল ইতিহাসে এর আগে মাত্র দুবার ঘটেছিল (১৯৬৬ ও ১৯৯০)। আর এই রূপকথার প্রধান নায়ক ২৩ বছর বয়সী রিয়াল মাদ্রিদ সেনসেশন জুড বেলিংহাম!

বেলিংহাম মাত্র ২৩ বছর ১২ দিন বয়সে বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বের টানা দুই ম্যাচে জোড়া বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন, যেখানে তাঁর সামনে আছেন শুধু কিংবদন্তি পেলে (১৯৫৮ সালে ১৭ বছর ২৪৯ দিন)। এছাড়া ফুটবল ইতিহাসে ডিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬), গারিঞ্চা (১৯৬২) এবং পেলের মতো মহাতারকাদের পাশে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে দুটি ‘মাল্টি-গোল’ ম্যাচ খেলার অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়লেন বেলিংহাম।

kain
চলতি আসরে হ্যারি কেন (৬ গোল) এবং বেলিংহাম (৬ গোল) ইংল্যান্ডের প্রথম সতীর্থ জুটি হিসেবে একই বিশ্বকাপে পাঁচের বেশি গোল করার রেকর্ড গড়লেন। বিশ্বকাপে বেলিংহামের মোট গোল এখন ৭টি, যার ফলে কেন (১৪) ও লিনেকারের (১০) পর তিনি ইংল্যান্ডের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। এমনকি নিজের ২৪তম জন্মদিনের আগে বিশ্বকাপে পেলের সমান ৭ গোল করে ফেললেন বেলিংহাম, যেখানে তাঁর ওপরে আছেন কেবল কিলিয়ান এমবাপ্পে (১২ গোল)।

এই জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড তাদের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখল, যা ২০১৮ সালের পর প্রথম। এবারের বিশ্বকাপে নক-আউট পর্বের ২৮টি ম্যাচের মধ্যে ৮টি ম্যাচই এক্সট্রা টাইমে গড়িয়েছে, যা ২০১৪ ও ১৯৯০ সালের রেকর্ডের সমান।

এখন ফুটবল দুনিয়া অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আগামী বুধবারে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে থ্রি-লায়ন্সদের সেই ‘হাই-ভোল্টেজ’ সেমিফাইনালের মহারণ দেখার জন্য!