বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে যখন ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন মাঠের পুরনো বৈরিতার সাথে যোগ হয়েছে এক আধুনিক মায়ামি টুইস্ট! আর এই হাইভোল্টেজ মহাযুদ্ধের কারণে ইন্টার মায়ামির মালিক ডেভিড বেকহ্যাম ফুটবলীয় এক অদ্ভুত সংকটে পড়েছেন।
নিজের ক্লাবের সবচেয়ে বড় মুখ ও বিশ্বজয়ী তারকা লিওনেল মেসির প্রতি বেকহ্যামের আনুগত্যের কথা সবার জানা, যার হাত ধরে ইন্টার মায়ামির আজ বিশ্বজুড়ে এত নামডাক। কিন্তু বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এই ক্লাব মালিককে এনে দাঁড় করিয়েছে তাঁর ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ের ঠিক উল্টো পিঠে!
আগামী বুধবারের সেমিফাইনালে বেকহ্যামের সমর্থন যে থ্রি-লায়ন্স বা ইংল্যান্ডের পক্ষেই থাকবে, তা বলাই বাহুল্য, কারণ এই দলেরই কাপ্তান হিসেবে একসময় বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি চাইবেন থ্রি-লায়ন্সদের চূর্ণ করে আর্জেন্টিনাকে আরও একটি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যেতে, যেন তাঁর ফুটবল রূপকথার শেষ অধ্যায়টি রাজকীয়ভাবে রাঙানো যায়।
এমএলএস সকার ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্টজুড়ে মেসির প্রতিটি ম্যাচ খুব খুঁটিয়ে দেখছেন বেকহ্যাম। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গ্যালারিতে বসা বেকহ্যাম মিসরের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য কামব্যাকের পর ইন্টার মায়ামি অধিনায়ক মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেছিলেন, মেসি শুধু মাঠের জাদুকরই নয়, মাঠের বাইরেও একজন চমৎকার ও অসাধারণ মানুষ। আর এই গভীর শ্রদ্ধাবোধই আগামী বুধবারের সেমিফাইনালকে আরও বেশি নাটকীয় ও অনন্য করে তুলেছে।
অবশ্য এই তথাকথিত ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বা বৈরিতা শুধুই প্রতীকী, ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়। বেকহ্যাম ইন্টার মায়ামিতে মেসিকে মোটেও ত্যাগ করছেন না, যেখানে তাদের যুগলবন্দী ক্লাবটির বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড ভ্যালুর প্রধান ভিত্তি। তবে মাঠের ৯০ বা ১২০ মিনিটের জন্য, বেকহ্যামের ভেতরের কট্টর ইংলিশ সত্ত্বাটি দাঁড়িয়ে যাবে সেই মানুষটির বিরুদ্ধে, যিনি তাঁর মায়ামি প্রজেক্টকে রাতারাতি এক বৈশ্বিক উন্মাদনায় পরিণত করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেকহ্যাম ইন্টার মায়ামির ‘মাটি প্রস্তুত’ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জিতে মেসি আসার পরই ক্লাবটির পুরো চেহারাই বদলে যায়। মেসি এমএলএস’র সবচেয়ে পুরনো বা সবচেয়ে সফল ক্লাবে যোগ দেননি; তিনি এসেছিলেন বেকহ্যামের স্বপ্নের প্রজেক্টে আর এসেই সেটাকে বদলে দেন আমূল। মায়ামিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম ট্রফি হিসেবে ‘লিগস কাপ’ এনে দেয়ার পর তাঁর হাত ধরেই আসে ‘সাপোর্টার্স শিল্ড’ এবং ঐতিহাসিক ‘এমএলএস কাপ’।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় শত্রুতার পেছনের ইতিহাস রক্তক্ষয়ী, তা সে ১৯৬৬ সালের লড়াই হোক, ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত 'হ্যান্ড অব গড' হোক, কিংবা ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের সেই অভিশপ্ত লাল কার্ডের ট্র্যাজেডিই হোক। প্রতিটি মোড়ে জড়িয়ে আছে তীব্র উত্তেজনা।
তবে এবার আলবিসেলেস্তেদের পক্ষে সবচেয়ে বড় আবেগ আর শক্তির নাম মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও এই জাদু পুরো একটা দেশকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে পারেন, যার কারণে এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি নক-আউট ম্যাচকে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা দেখছেন মেসির শেষ ‘বিশ্বজয় মিশন’ হিসেবে।
এখন দেখার বিষয়, আটলান্টার সেমিফাইনালে বেকহ্যামের দেশ ইংল্যান্ড শেষ হাসি হাসে, নাকি নিজের ক্লাবের বসের বুক ভেঙে দিয়ে মেসি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালের মঞ্চে নিয়ে যান!