গেলো দশকের রাজকীয় ফর্ম ধরে রেখে ২০২৬ বিশ্বকাপেও অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। শনিবার কানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডের ১০ জনের লড়াকু দলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয়ের পর এবার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এই ঐতিহাসিক জয়ের পর আলবিসেলেস্তেদের এই অবিশ্বাস্য ও টানা সাফল্যকে সরাসরি ‘অস্বাভাবিক’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন স্বয়ং কাপ্তান মেসি! তিন বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এখন তাদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ ট্রফি ধরে রাখার মিশন থেকে মাত্র দুই ধাপ দূরে।

ম্যাচ শেষে ‘ইএসপিএন আর্জেন্টিনা’-র সাথে কথা বলার সময় মেসি বেশ চনমনে মেজাজে তাঁর মনের ঝাঁঝালো ভাব প্রকাশ করেন। বিশ্বজয়ের পর দলের ক্ষুধা ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যে কতটা কঠিন, তা মনে করিয়ে দিয়ে মেসি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ যেভাবে এই মুহূর্তগুলো উদযাপন করছে, তা সত্যিই দারুণ। এই দলটা মানুষকে এমন কিছু জিনিসে অভ্যস্ত করে তুলেছে যা মোটেও স্বাভাবিক নয়! একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, সম্ভাব্য সব কিছু জেতার পর, আবারও সেই একই খিদে নিয়ে লড়াই করা, শীর্ষ চারে থাকা এবং আরেকটি সেমিফাইনাল খেলা, এগুলো মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আর এই কারণেই এই সাফল্যকে আমাদের মনভরে উপভোগ করতে হবে।

মেসি আরও যোগ করেন, ভবিষ্যতে এমন সোনালী সময় আবারও আসবে কিনা, বা কবে আসবে, তা আমরা কেউই জানি না। কাতার বিশ্বকাপের আগে আমরা দীর্ঘ সময় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। তাই এখন যা কিছুই অর্জিত হচ্ছে, তার প্রতিটির মূল্যায়ন করা উচিত।
শনিবারের ম্যাচে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে আর্জেন্টিনা প্রথমে লিড নিলেও ৬৭ মিনিটে ড্যান এনদোয়ের গোলে দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফেরে সুইজারল্যান্ড। যখনই মনে হচ্ছিল সুইসরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই পুরো খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এক মহানাটকীয় ‘ভিএআর’ সিদ্ধান্ত!

সুইস তারকা ব্রিল এমবোলোর একটি ফাউলের আবেদন ভিএআর রিভিউতে উল্টো পেনাল্টি বা ফাউলের বদলে ‘ডাইভিং’ বা অভিনয়ের অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। রেফারি তাঁকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠ ছাড়া করলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় সুইজারল্যান্ড।
ম্যাচের এই কঠিন লড়াই নিয়ে মেসি বলেন, আমরা জানতাম ম্যাচটা কঠিন হবে। প্রথমার্ধে লিড নিলেও ওরা আমাদের বোতলবন্দী করে ফেলেছিল। আমরা আমাদের স্বাভাবিক পাসিং গেম খেলতে পারছিলাম না এবং বল পজেশন ধরে রাখতে না পেরে ডিফেন্সে বড্ড বেশি নিচে নেমে গিয়েছিলাম। ওদের লাল কার্ডটি পুরো ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে দিলেও শেষ পর্যন্ত জয় পাওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের এক চোখধাঁধানো রকেট শট এবং লাউতারো মার্টিনেজের ফিনিশিং গোল আর্জেন্টিনাকে উল্লাসে ভাসিয়ে শেষ চারে নিয়ে যায়।

আগামী বুধবার আটলান্টার সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড, যে দলটির বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারে এর আগে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কখনোই খেলেননি লিওনেল মেসি! তবে মেসি না খেললেও এই দুই দেশের ফুটবলীয় শত্রুতার ইতিহাস বড্ড পুরনো ও অম্লমধুর। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক 'হ্যান্ড অব গড' গোল এবং এরপর ফুটবল ইতিহাসের সেরা একক গোলটির স্মৃতি আজও দু'দেশের সমর্থকদের মনে তরতাজা।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই মেগা ফাইট এবং ম্যারাডোনার স্মৃতি নিয়ে মেসির ‘সসি’ মন্তব্য, ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচের যা কিছু আমি দেখেছি বা মনে রেখেছি, তা শুধুই বিভিন্ন ভিডিও আর ছবি থেকে; যা আমরা আর্জেন্টাইনরা প্রতিনিয়ত দেখি এবং নতুন করে বাঁচি। তবে এই দলটা প্রতিপক্ষ কে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শুধু নিজেদের ফুটবল খেলতেই অভ্যস্ত।

মেসি তাঁর ভেতরের উত্তেজনা প্রকাশ করে আরও বলেন, অবশ্যই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলাটা স্পেশাল, কারণ ওরা বিশ্বফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। আর, পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াই সবসময়ই অন্যরকম রোমাঞ্চ নিয়ে আসে। ব্যক্তিগতভাবে এটিই হতে যাচ্ছে ওদের বিরুদ্ধে আমার প্রথম ম্যাচ! আমি ফুটবল বিশ্বের প্রায় সবার বিরুদ্ধে খেললেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা বাকি ছিল, তাই আমার জন্য ম্যাচটি ভীষণ আনন্দের। আমরা ম্যাচটিকে একটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখছি এবং সেমিতে নিজেদের সেরাটা দিয়ে আবার লড়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই মাঠে নামব।
দেখার বিষয়, আটলান্টার মাঠে মেসির এই প্রথম ইংল্যান্ড বধের মিশন সফল হয়, নাকি থ্রি-লায়ন্সরা সেই প্রতিশোধ নিয়ে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার কাপ নেওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দেয়!
