২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি! ৪৪টি দলকে বিদায় করে নিউ জার্সির ১৯ জুলাইয়ের সেই সোনার ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নে এখন বিভোর মাত্র চারটি পরাশক্তি- ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের এই হেভিওয়েট থ্রিলার শুরু হওয়ার আগে ইএসপিএন’র দেয়া এক্সক্লুসিভ তথ্যে দেখে নেয়া যাক, দুই সেমিফাইনালের রণকৌশল কেমন হতে যাচ্ছে এবং কার পাল্লা কতটা ভারী!
প্রথম সেমিফাইনাল: ফ্রান্স বনাম স্পেন (টেক্সাস)
ফরাসি গোলমেশিনের রাজকীয় যাত্রা: দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটি ছিল একদম মসৃণ। ৬ ম্যাচের সব কটিতে জিতে তারা গোল করেছে ১৬টি! কিলিয়ান এমবাপ্পে (৮ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট), উসমান দেম্বেলে (৫ গোল, ২ অ্যাসিস্ট) এবং মাইকেল অলিসের (৫ অ্যাসিস্ট) আক্রমণাত্মক ত্রিমূর্তি প্রতিপক্ষকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর নকআউটে সুইডেন, প্যারাগুয়ে এবং সবশেষে আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কোকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে সেমির টিকিট কাটে তারা। ৩৯ বছর বয়সী মেসির পরেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২০টি গোলের মালিক এখন রিয়াল মাদ্রিদ মহাতারকা এমবাপ্পে, যিনি ফ্রান্সকে আরও একটি ট্রফি এনে দিতে মরিয়া।
স্পেনের শেষ মুহূর্তের ম্যাজিক ও নিরেট ডিফেন্স: ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন হয়তো এখনো তাদের চেনা ছন্দ বা টপ গিয়ারে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল খেলছে চরম ঠাণ্ডা মাথায়। টুর্নামেন্টের সেরা ডিফেন্স নিয়ে ৬ ম্যাচে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ১টি! শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিরুদ্ধে ৯০ মিনিটের মাথায় মিকেল মেরিনোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে তারা। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও সেই মেরিনো ৮৮ মিনিটে গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে জেতান। চোটে জর্জরিত ১৭ বছরের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল ও মাঝমাঠের জেনারেল রদ্রিগো ধীরে ধীরে নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন।
কোথায় নির্ধারিত হবে ম্যাচের ভাগ্য: স্পেন তাদের স্বভাবসুলভ বল পজেশন বা তিকিতাকা দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে ও ফ্রান্সকে বল থেকে দূরে রাখতে চাইবে। কিন্তু ফ্রান্সের শক্তির জায়গা হলো তাদের বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক। হাই-লাইন ডিফেন্স রাখা স্পেনের কাছ থেকে মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে এমবাপের অতিমানবীয় গতি আর অলিসের পাসিং ভিশন যে কোনো মুহূর্তে স্পেনের বুক চুরমার করে দিতে পারে। স্প্যানিশ মাঝমাঠের প্রধান রদ্রিগো ফরাসিদের এই ১০-১২টি কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগ রুখতে পারেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্স ৩-১ বা ২-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে ফাইনালে যেতে পারে, যদিও কেউ কেউ স্পেনের পজেশনাল ফুটবলের পক্ষে বাজি ধরছেন।
দ্বিতীয় সেমিফাইনাল: ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা (আটলান্টা)
বেলিংহ্যামের কাঁধে ভর করে ইংলিশ লায়ন্সের পুনরুত্থান: ইংল্যান্ডের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রাটা ছিল এক চরম রোলার কোস্টার রাইড। ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনার পর ঘানার সাথে গোলশূন্য ড্র। এরপর কঙ্গো ডিআর-এর বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও হ্যারি কেনের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে রক্ষা। এরপর মেক্সিকোর মাঠের বৈরী পরিবেশ আর লাল কার্ডের ধাক্কা সামলে জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয়। সবশেষে কোয়ার্টারে মায়ামির ভ্যাপসা গরমে নরওয়েকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিতে পা রাখে থ্রি-লায়ন্স। রিয়াল মাদ্রিদের ২০ বছর বয়সী জুড বেলিংহ্যাম ৬ গোল নিয়ে এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল)-এর অন্যতম দাবিদার। কোচের সমালোচনার মুখে থাকা ইংল্যান্ড দলে ক্ষতের দাগ বেশি হলেও তাদের এনার্জি ও ফিটনেস এখন তুঙ্গে।
মেসি ম্যাজিক ও আর্জেন্টিনার ভাঙ্গা প্রাচীর: বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের প্রতিটা ম্যাচই ছিল হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মতো রুদ্ধশ্বাস! গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে সহজে হারালেও নকআউটে নবাগত কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে কোনোমতে জয় পায় তারা। এরপর মিসরের বিরুদ্ধে ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতেও ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল স্কালোনির দল। সেখান থেকে মেসি ও রোমেরোর ৪ মিনিটের ঝড়ে এবং এনজোর ৯৩ মিনিটের গোলে ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় আসে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের বিশ্বমানের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জেতে লাতিনরা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি একাই ৮ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট করে দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এবং বিশ্বকাপে রেকর্ড ২১ গোলের মালিক এখন তিনি।
যেভাবে নির্ধারিত হবে ম্যাচের ভাগ্য: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের রক্ষণভাগ বা ডিফেন্স। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তাদের গোল হজম করতে হচ্ছে এবং ডিফেন্ডারদের একদম শেষ মুহূর্তের ট্যাকলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশনে খেলায় উইঙ্গারদের বাদ দিয়ে মাঝমাঠে মেসিকে কেন্দ্র করে ৬ জন খেলোয়াড়কে রাখছে আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের প্রধান কাজ হবে মাঝমাঠে ডেক্লান রাইস, বেলিংহ্যাম ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনদের দিয়ে মেসির পায়ে বল যাওয়া বন্ধ করা এবং আর্জেন্টিনার নড়বড়ে ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে ওলটপালট করে দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণী বলছে, ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের পকেটে যেতে পারে, কারণ আর্জেন্টিনার শরীরী ভাষা ও এনার্জি শেষ হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। তবে, ম্যাচ টাইব্রেকার বা পেনাল্টি শুটআউটে গড়ালে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নিচে এমি মার্টিনেস নামক এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছেন, যা ইংলিশদের ঐতিহাসিক পেনাল্টি জুজুকে আরও একবার উসকে দিতে পারে! ড্রাফটকিংসের বাজি অনুযায়ী ইংল্যান্ড (-১৩৫) কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, আর্জেন্টিনার ওপরেও (+১১০) বাজিকরদের মোটা টাকা খাটছে। আটলান্টার গালিচায় বুধবারে কার কপাল পোড়ে আর কার ফাইনালের স্বপ্ন সত্যি হয়, তার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব!