মঙ্গলবারের টেক্সাস থ্রিলারে যখন ফ্রান্স আর স্পেন মেগা সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন ফরাসি ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন ২৪ বছর বয়সী এক উইঙ্গার। তিনি মাঠে নামলে মনে হয় ফুটবল নয়, ক্যানভাসে তুলির টান দিচ্ছেন কোনো এক শান্ত শিল্পী। নাম তাঁর মাইকেল অলিসে।
বায়ার্ন মিউনিখের এই আক্রমণাত্মক তারকা চলতি বিশ্বকাপে ফরাসি শিবিরের অন্যতম প্রধান গোলমেশিন ও ‘অ্যাসিস্ট কিং’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে অলিসেকে নিয়ে সবচেয়ে মুখরোচক গল্পটা কিন্তু মাঠের ফুটবল নয়, বরং তাঁর নাগরিকত্ব এবং ইংল্যান্ডের বুক চিরে ফ্রান্সের মন জয় করার চরম রোমাঞ্চকর ইতিহাস!

লন্ডনে জন্ম, শৈশব-কৈশোর কেটেছে ইংল্যান্ডের মাটিতে এবং ইংলিশ ফুটবলের নামী-দামী একাডেমিতেই তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি। অথচ যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেশের সিনিয়র জার্সি বেছে নেয়ার মোক্ষম সময় এল, তখন থ্রি-লায়ন্সদের ড্রেসিংরুমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অলিসে বেছে নিলেন ফ্রান্সকে!
লন্ডনের ঘরের ছেলেকে নিজেদের ডেরায় টেনে নিয়ে আজ বুক ফুলিয়ে অহংকার করছে ফরাসিরা। কারণ, কিলিয়ান এমবাপ্পে আর উসমান দেম্বেলের মতো জাদুকরেরা দলে থাকা সত্ত্বেও, এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণের আসল ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখন অলিসের হাতেই।
মাঠের বাইরে অলিসে এক পরম রহস্যময় চরিত্র। সংবাদমাধ্যমকে ইন্টারভিউ দিতে তাঁর চরম এলার্জি, লাইমলাইট থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসেন এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে রাখেন সাততালা চাবির নিচে। ফরাসি শিবিরের সবচেয়ে লাজুক ও মৃদুভাষী এই ছেলেটিই যখন বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে সবুজ গালিচায় নামেন, মুহূর্তেই যেন খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসেন এক বিধ্বংসী ও অহংকারী ফুটবলার!
তাঁর সাবেক কোচেরা সব সময়ই তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, নম্রতা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক পাগলাটে জেদের প্রশংসা করে এসেছেন।
প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে ড্রিবলিং করা, জাদুকরী সব অ্যাসিস্টের বন্যা বইয়ে দেওয়া আর প্রতিটা পাসকে এক একটি গোলের সুযোগে রূপান্তর করাই অলিসের দৈনন্দিন কাজ।

মাঠে বল পায়ে তিনি যখন মাথা তুলে তাকান, তখন ডিফেন্সের এমন সব ফাঁকফোকর তিনি খুঁজে বের করেন যা সাধারণ কোনো ফুটবলারের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। শান্ত, মার্জিত কিন্তু চরম অনাকাঙ্ক্ষিত, এই তিনের মিশেলে অলিসে এখন ফ্রান্সের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই ইউরোপের বড় বড় বোদ্ধারা অলিসেকে এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় বা গোল্ডেন বলের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে গণ্য করছেন। ইংল্যান্ড হয়তো তাঁর শৈশবের ভিত গড়ে দিয়েছিল, কিন্তু এই ফরাসি গতিদানব নিজের মনটা সঁপে দিয়েছেন ‘লেস ব্লুস’দের আকাশী-নীল জার্সিতেই।
মঙ্গলবার টেক্সাসের মাঠে স্পেনের ডিফেন্সকে চাটনি বানিয়ে অলিসের এই ফুটবল শিল্প ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলতে পারে কি না, তা দেখার জন্য উত্তেজনায় কাঁপছে পুরো ফুটবল দুনিয়া!
