২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা সেমিফাইনালে যখন ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা, তখন ফুটবল বিশ্বের সব আলো কেড়ে নিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী বুড়ো জাদুকর লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, ৬টি বিশ্বকাপ এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সব পরাশক্তিকে এক হাত নিলেও থ্রি-লায়ন্সদের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার সিনিয়র জার্সিতে মেসির এখনো কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মেসি যখন দলে ছিলেন, তখন কেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর খেলা হয়নি? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, এর পেছনে জড়িয়ে আছে দুই দশক পুরনো এক চরম নাটকীয়তা এবং মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কালো দিন!
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের শেষ দেখা হয়েছিল আজ থেকে ২১ বছর আগে, ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে। তখন মেসির বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। বার্সেলোনার এই বিস্ময় বালক সদ্য অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ হোসে পেকারম্যানের অধীনে সিনিয়র দলে নিজের জায়গা পাকা করার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। কিন্তু তার কিছুদিন আগেই ঘটে যায় এক নজিরবিহীন বিপর্যয়!
হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির অভিষেক হয়েছিল। কিন্তু মাঠে নামার ঠিক ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় কনুই দিয়ে এক ডিফেন্ডারকে আঘাত করার অপরাধে রেফারি তাঁকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন। অভিষেকের এই দুঃস্বপ্নের লাল কার্ডের কারণেই আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা জোটে মেসির কপালে। আর সেই অলক্ষুণে নিষেধাজ্ঞার কোপটা গিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড ম্যাচের ওপর! দলের সাথে জেনেভায় ভ্রমণ করলেও গ্যালারিতে বসে সতীর্থদের মারামারি দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ১৮ বছরের সেই তরুণ মেসির।
মেসিহীন সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য গোলবন্যা দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব। হার্নান ক্রেস্পোর গোলে আর্জেন্টিনা প্রথমে এগিয়ে গেলেও ইংল্যান্ডের হয়ে সমতা ফেরান ওয়েন রুনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ওয়াল্টার স্যামুয়েলের গোলে আর্জেন্টিনা আবারও ২-১ ব্যবধানে লিড নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল! ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে মাইকেল ওয়েনের জাদুকরী জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানের এক রূপকথার জয় ছিনিয়ে নেয় ইংল্যান্ড।
এই ম্যাচের ঠিক চার দিন পরেই অবশ্য মেসি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে কাতারের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ে মূল একাদশে ফেরেন, কিন্তু ততক্ষণে থ্রি-লায়ন্সদের চাটনি বানানোর প্রথম সুযোগটি তাঁর হাত থেকে ফসকে যায়। দীর্ঘ দুই দশক পর সেই সুযোগ আবার ফিরে এসেছে।
মজার ব্যাপার হলো, ২০০৫ সালের সেই জেনেভা থ্রিলারে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ হিসেবে মাঠে থাকা দুই কিংবদন্তি খেলোয়াড় এখনও দলটির সাথে যুক্ত আছেন। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার সেন্ট্রাল ডিফেন্সে খেলা ওয়াল্টার স্যামুয়েল এবং রবার্তো আয়ালা এখন কোচ লিওনেল স্কালোনির ড্রেসিংরুমের অন্যতম প্রধান মাস্টারমাইন্ড ও সহকারী কোচ!
২০০৫ সালের সেই আক্ষেপ ভুলে, দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে হ্যারি কেনদের মুখোমুখি হতে চলেছেন এলএমটেন। এবার আর কোনো প্রীতি ম্যাচ নয়, এবার লড়াইটা সরাসরি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার! ৪৭ সেকেন্ডের সেই লাল কার্ডের অভিশাপ কাটিয়ে ৩৯ বছরের মেসি এবার আটলান্টার মাটিতে ব্রিটিশদের অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে পারেন কি না, তার ওপর চোখ রাখছে পুরো ফুটবল দুনিয়া!