ট্র্যাজেডির মাঝেও অমলিন মেসি-আর্জেন্টিনা বন্ধন

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা প্রদান অনুষ্ঠানে যখন নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম আলো ঝলমলে হয়ে উঠেছিল, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থকের চোখ ফুটবল বিশ্বকে অন্য এক দৃশ্য উপহার দিচ্ছিল। রানিং-আপ মেডেল গলায় নেওয়ার পরপরই জুতো খুলে মোজা পরা পায়ে গোলপোস্টের পেছনে থাকা সমর্থকদের দিকে এগিয়ে যান লিওনেল মেসি।

সেখানে তাঁর জন্য কোনো খোঁচা বা ক্ষোভ ছিল না; বরং ৪৫ দিন আগে কানসাস সিটি থেকে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা শেষেও সমর্থকরা হাত তুলে বিশ্বসেরা এই জাদুকরকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছিল আর সুর তুলে গাইছিলো- ‘Meeeeessi! Meeeeessi!’। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শেষে ৩৯ বছর বয়সের এই অধিনায়কের কাছে দেশের মানুষের আর কোনো দাবি ছিল না, ছিল শুধুই অশেষ কৃতজ্ঞতা।

Messi Lost 01
ঠিক ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালে, একই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বেদনায় ভরা। সেবার চিলির বিরুদ্ধে কোপা আমেরিকা সেন্তেনারিওর ফাইনালে পেনাল্টি মিস করে ম্যাচ হারার পর হতাশায় চাদর মুড়ি দেওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল মেসির।

একা বেঞ্চে বসে কান্না আর নিঃসঙ্গতায় ভেঙে পড়া সেই তরুণ মেসি মিক্সড জোনে এসে বলে ফেলেন, জাতীয় দলের হয়ে আমার পথচলা এখানেই শেষ। তবে সেই সিদ্ধান্তের মাত্র ৬৬ দিন পর আবার আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে মাঠে ফেরেন তিনি। এরপর ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে বিশ্বজয়ের মাধ্যমে ফুটবলের সব স্বপ্ন সত্যি করেন এই রোসারিও পুত্র।

Messi Mess 02
২০২৬ বিশ্বকাপের এক অনন্য মেসি:  
ফাইনালে নামার আগে মেসি বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি শিখেছি, জয়ের চেয়ে পরাজয়ের সংখ্যাই বেশি থাকে, যা আমাকে মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে পরিপক্ক হতে সাহায্য করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী মেসি শুধু সেরা গোলদাতা বা অ্যাসিস্টের কারিগর ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নতুন ফুটবল দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। গতি ও শারীরিক সক্ষমতায় আগের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও তাঁর বাঁ পায়ের জাদুকরী স্পর্শ এবং মাঠের জায়গা চেনার ক্ষমতা ছিল আগের মতোই নিখুঁত।

রাউন্ড অব ১৬-এ মিসরের বিরুদ্ধে চোখ দিয়ে গড়ানো জল, কিংবা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কামব্যাকের সেই বুনো গর্জন, পুরো টুর্নামেন্টেই মেসি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে দুটি অ্যাসিস্ট করে মহাকাব্যিক জয় এনে দেয়া কিংবা কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে মিয়ামির চরম গরমে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়া, প্রতিটি ম্যাচেই মেসি নিজের অতীতের ছায়া বজায় রেখেছিলেন।

Messi Mess 01
স্পেনের শক্ত প্রাচীর এবং নিঃশেষিত এক দল:
ফাইনালে এসে স্পেনের বিরুদ্ধে মেসি ও তাঁর দল মারাত্মক ক্লান্তিতে ভুগছিল। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া ও জর্ডান ছাড়া নকআউটের প্রতিটি ম্যাচের প্রতি মিনিটে মাঠে লড়েছিলেন অধিনায়ক নিজেই। ফাইনালে তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সি ও গোল্ডেন বল জয়ী রদ্রির নিরেট মিডফিল্ডের সামনে মেসিকে বেশ লড়াই করতে হয়েছে। কোনো জায়গা খুঁজে পাননি তিনি, তাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গেছেন এক অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায়।

স্পেন ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর যখন খেলোয়াড়দের শরীরে আর একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, তখন গ্যালারির আবেগ তাদের জড়িয়ে ধরেছিল। ২০১৯ সালে মেসি বলেছিলেন, আমি শেষ চেষ্টা না করে থামতে চাই না। তিনি থামেননি, জেতার পরও খেলে গেছেন, কেবল ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের জার্সিটার টানে। ২০১৬ সালের সেই নিঃসঙ্গ করুণ রাতের তুলনায় এবার রাতটি হয়তো কাপ ছাড়া শেষ হয়েছে, তবে মেসির মহাকাব্যটি শেষ হয়েছে সমর্থকদের অকৃত্রিম ভালোবাসার এক পরম পূর্ণতায়।