ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হলো 'ব্যালন ডি’অর' । এই সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের প্রতিটি পেশাদার ফুটবলার। কারও ক্যারিয়ারে এটি হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত শিখর, আবার কারও ক্ষেত্রে তা জন্ম দেয় তুমুল বিতর্ক ও আলোচনার।
কে সেরা, কার হাতে উঠবে গোল্ডেন বল, এসব নিয়ে বছরজুড়েই চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু এত জৌলুস, সম্মান আর বিশ্বজোড়া পরিচিতির আড়ালে এমন কিছু তথ্য লুকিয়ে আছে, যা অনেকেরই অজানা। ট্রফিটি কি সত্যিই খাঁটি স্বর্ণের তৈরি? এর দামই বা কত? আর যিনি এই মহার্ঘ পুরস্কার জেতেন, তিনি কত টাকা পান?
১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ইউরোপের সেরা খেলোয়াড়কে সম্মানিত করার লক্ষ্য নিয়ে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের যাত্রা শুরু করেছিল। ইতিহাসের প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতার গৌরব অর্জন করেছিলেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্যানলি ম্যাথিউস। এরপর আলফ্রেদো দি স্তেফানো, জর্জ বেস্ট, ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি ও মার্কো ফন বাস্তেনের মতো রূপকথার নায়করা এই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
সময়ের হাত ধরে ১৯৯৫ সালে ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়দের জন্য এবং ২০০৭ সালে তা গোটা বিশ্বের পেশাদার ফুটবলারদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২০১৮ সালে নারী ফুটবলারদের জন্যও চালু হয় এই পুরস্কার। মাঝখানে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফিফার ব্যক্তিগত পুরস্কারের সঙ্গে একীভূত হয়ে এটি ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’ নামে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে দুইপক্ষ আবার আলাদা হয়ে যায়।
সোনালি ঝিলমিল দেখে যে কারও মনে হতে পারে ব্যালন ডি’অর বুঝি পুরোটাই খাঁটি সোনা দিয়ে মোড়ানো। কিন্তু বাস্তবে তা সম্পূর্ণ ভুল। ফ্রান্সের নামী গহনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘মেলেরিও’ সম্পূর্ণ হাতে তৈরি করে এই ট্রফি। একটি ট্রফি বানাতে সময় লাগে প্রায় ১০০ ঘণ্টা এবং হস্তান্তরের ছয় মাস আগে থেকেই শুরু হয় এর কারুকার্য।
ফুটবলের আকৃতি দেওয়ার জন্য পিতলের দুটি অর্ধগোলক জোড়া লাগিয়ে ৩২টি প্যানেলের নকশা খোদাই করা হয়। এরপর পৃষ্ঠতল মসৃণ করে তাতে খোদাই করা হয় ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর লোগো ও সংশ্লিষ্ট বছর। সবশেষে এর ওপর দেয়া হয় স্বর্ণের আসল প্রলেপ এবং পাইরাইট পাথরের তৈরি মজবুত ভিত্তির ওপর স্থাপন করা হয় ট্রফিটি। প্রায় ৩১ সেন্টিমিটার উচ্চতা, ২৩ সেন্টিমিটার প্রস্থ এবং ১০ কেজিরও বেশি ওজনের এই ট্রফি তৈরিতে বিভিন্ন সূত্রে আনুমানিক খরচ পড়ে মাত্র তিন হাজার ইউরো!
বিশ্ব ফুটবলের কোটি টাকার বাজারে এই অঙ্ক অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কারণ আয়োজক কর্তৃপক্ষ কখনোই এর আনুষ্ঠানিক আর্থিক মূল্য প্রকাশ করে না।
ব্যালন ডি’অর জিতলে কত টাকা পান বিজয়ী? এখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় চমক। ব্যালন ডি’অর জিতলে ‘ফ্রান্স ফুটবল’ বা আয়োজক সংস্থা থেকে সরাসরি কোনো নগদ অর্থ পুরস্কার পান না বিজয়ী ফুটবলাররা। নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক অঙ্কের চেকও তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় না।
তবে নগদ অর্থ না মিললেও এই ট্রফি একজন ফুটবলারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আসমানসমান উচ্চতায় নিয়ে যায়। পুরস্কারটি জেতার পরপরই নতুন স্পন্সরশিপ চুক্তি, বিজ্ঞাপনের অফার এবং ক্লাবের সঙ্গে আকাশচুম্বী মূল্যে চুক্তি নবায়নের রাস্তা খুলে যায়।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ২০১৮ সালের বিজয়ী লুকা মদরিচ, যিনি ব্যালন ডি’অর জেতার পর স্পনসর প্রতিষ্ঠান নাইকি থেকে প্রায় আট লাখ ইউরোর বোনাস পেয়েছিলেন এবং তাঁর নামে বিশেষ বুট বাজারে ছাড়া হয়েছিল। নারী ফুটবলের তারকা আইতানা বনমাতির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি; তাঁর এই জয় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বিশাল অঙ্কের চুক্তি নিশ্চিত করেছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্যালন ডি’অর সরাসরি কোনো নগদ নারায়ণ না দিলেও ফুটবলারের বাজারমূল্য, ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং বিপণন-সামর্থ্যকে এমন এক ছাদতলায় পৌঁছে দেয়, যার আর্থিক মূল্য কোটি কোটি টাকারও বেশি!