১৯৫৬ সালে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউসের হাতে যখন ট্রফিটি তুলে দেয়া হয়েছিল, তখন অনুষ্ঠান বলতে ছিল ইংল্যান্ডের ব্ল্যাকপুল টাউন হলের ছোট্ট একটি কক্ষ। কোনো হইচই নেই, কোনো আলো ঝলমলে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নেই।
অথচ ঠিক ৭০ বছর পর, ২০২৬ সালে এসে লন্ডনের ঐতিহাসিক ‘দ্য লন্ডন প্যালাডিয়াম’-এ আয়োজিত হচ্ছে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম বর্ষপূর্তির মহাসমারোহ। রেড কার্পেট বেয়ে নামছেন বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা, আর স্ক্রিনের সামনে ব্যাকুল হয়ে বসে আছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।

মাত্র কয়েক দশক আগেও এই ব্যক্তিগত পুরস্কারটি নিয়ে ফুটবলারদের বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। ২০০১ সালের বিজয়ী মাইকেল ওয়েন ট্রফি জয়ের পর স্বীকার করেছিলেন যে তিনি জানতেনই না ব্যালন ডি’অর আসলে কী জিনিস! কিন্তু সেই অখ্যাত ট্রফিই আজ কীভাবে দলীয় খেলা ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক অ্যাওয়ার্ডে পরিণত হলো?
ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর সম্পাদক ও লেখকদের মাথায় যখন প্রথম এই পুরস্কারের চিন্তা আসে, তখন উদ্দেশ্য ছিল শুধুই পত্রিকার বিক্রি বাড়ানো। ফরাসি সাংবাদিক জেরার্ড এজনেসের ভাষায়, এটি জন্ম নিয়েছিল চরম একঘেয়েমি থেকে। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কেবল ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের এই পুরস্কার দেওয়া হতো; পরে তা বিশ্বের সব দেশের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা গ্যারিঞ্চার মতো সর্বকালের সেরা কিংবদন্তিদের নাম কিন্তু এই ট্রফির বিজয়ী তালিকায় নেই!

তবে ব্যালন ডি’অরকে আজকের এই বিশাল মহীরুহে রূপ দেয়ার মূল কৃতিত্ব লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর। টানা এক দশক তারা দুজনে ফুটবল বিশ্ব শাসন করেছেন এবং এই ট্রফিটিকে বানিয়ে তুলেছেন নিজেদের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্র। মিডিয়া ও বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থক এই ট্রফিকেই তাদের শ্রেষ্ঠত্বের মূল মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে। ফ্রান্স ফুটবলের সাবেক পরিচালক পাসকাল ফেরের কথায়, ওরা ১০ বছর মুখোমুখি লড়াই করেছে, আর তার পুরো সুবিধাটা তুলে নিয়েছে ফ্রান্স ফুটবল।
আজকের দিনে ব্যালন ডি’অর আর শুধু কোনো ট্রফি নয়, এটি এক বিরাট বাণিজ্যিক বাজার। একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা ‘অস্কার’-এর মতো একটি ব্যালন ডি’অর বিজয়ী খেলোয়াড়ের বাজারমূল্যও রাতারাতি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার-আর্নল্ডের মতো তারকা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ক্লাবের হয়ে লিগ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার চেয়েও ব্যালন ডি’অর জেতা তাঁর কাছে বড় স্বপ্ন। ২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ট্রফি না পাওয়ায় রিয়াল মাদ্রিদের অনুষ্ঠান বয়কট প্রমাণ করে, ক্লাবগুলো এই ট্রফির জন্য কতটা মরিয়া!

ফুটবলের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দেউলিয়াত্ব ১০ বছর আগেই টের পেয়েছিলেন কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ভেঙ্গার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমি ব্যালন ডি’অরের ঘোর বিরোধী। কারণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারের মোহে পড়ে বহু খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস হতে দেখেছি। এটা খেলায় আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ায়। তাঁর চিরপ্রতিকূল কোচ জোসে মরিনহোও একমত হয়ে বলেছিলেন, ফুটবল এখন তার মূল দলগত সৌন্দর্য হারিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
বর্তমান যুগে ব্যালন ডি’অর জেতার জন্য কেবল মাঠের পারফরম্যান্সই যথেষ্ট নয়; প্রার্থীরা হরদম মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। কিলিয়ান এমবাপে বা লামিনে ইয়ামালের মতো তারকাদের মৌসুমের শুরুতেই ভোট চাওয়ার দৌড়ঝাঁপ দেখা গেছে। তবে আয়োজকদের মতে, মিডিয়া স্টান্ট দিয়ে ভোট পাওয়া যায় না, বরং অতিরিক্ত সুর চড়ালে ভোটাররা বিরক্তও হতে পারেন।

৮৬ জন খেলোয়াড় ও ১০ জন কোচের মনোনয়ন নিয়ে এবারের আয়োজনে পুরুষ ও নারী ফুটবলের প্রায় সব নামী মুখকেই দেখা যাচ্ছে থিয়েরি অঁরি ও কেট স্কটের জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থাপনায়। ফ্রান্স থেকে সাময়িকভাবে অনুষ্ঠানটি লন্ডনে স্থানান্তরিত হলেও, স্পন্সর ও বিশ্বখ্যাত তারকাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বানাতে ব্যালন ডি’অর যে এখন সম্পূর্ণভাবেই এক 'হলিউডি সার্কাসে' পরিণত হয়েছে, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই!
তথ্যসূত্র: গোল ডটকম
