আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

লক্ষ্মীপুরে ১৬৫ জনকে আসামি করে মামলা, গ্রেপ্তার চার

লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ১৬৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. মহসিন বাদি হয়ে এ মামলা দায়ের করেন। এদিকে ঘটনার পর থেকে চন্দ্রগঞ্জ বাজারে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।  

পুলিশ জানায়, মামলায় চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুর রহমান, থানা আওয়ামী লীগ নেতা সফিকুল ইসলাম শিপন খলিফা, চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান মিজান, থানা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক রিয়াজ হোসেন জয়সহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ জনকে আসামি করা হয়।

এর আগে বুধবার রাতে চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজারে লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ ও পুলিশের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় রাতে ১২ জনকে আটক করে পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী সোলায়মান ও ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সমর্থকরা এ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এসময় আহত হন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই জাকির হোসেন, চন্দ্রগঞ্জ থানার এসআই আব্দুর রহিম ও কনস্টেবল মোজাম্মেল হোসেন এবং ছাত্রলীগ কর্মী আকবর হোসেন, আব্দুর রহমান, হাসান, রাজু ও রাজিবসহ অন্তত ১৫ জন। এরমধ্যে আকবর হোসেনকে গুরুতর অবস্থায় জেলার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া আহত পুলিশ সদস্যদের সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এদিকে মামলার পর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চন্দ্রগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তহিদুল ইসলাম।

তিনি জানান, এ ঘটনায় চন্দ্রগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করা সফিকুল ইসলাম শিপন খলিফা, রিয়াজ হোসেন জয়, ছাত্রলীগের নেতা এম সজীব ও রিফাত হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অন্য আটকৃত ১৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়।  

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চন্দ্রগঞ্জ ইউপি নির্বাচনে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নৌকার বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান পদে ভোট করেন। পরে দলীয় নেতৃবৃন্দ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আমিনকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। এরপর সিনিয়র সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন লিঠনকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। হঠাৎ ইউনিয়নের দুইটি ওয়ার্ডে থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে না জানিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা ওয়ার্ড কমিটি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন থানা আওয়ামী লীগের নেতারা।

এতে মঙ্গলবার চন্দ্রগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কাশের চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওহাব তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটিকে কোনো ধরণের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির একটি চিঠি প্রকাশ করেন। এতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক বহিষ্কৃত সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিনকেও সদস্য করা হয়। ফলে পূর্বের কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গিয়াস উদ্দিন লিঠন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী সোলায়মান ওইরাতে তাদের অনুসারীদের বিক্ষোভ মিছিল করে।

আরও পড়ুন: গুলিস্তানের ভবনের ভেতরে আর মৃতদেহ নেই: ফায়ার সার্ভিস

বুধবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় উভয়পক্ষ পুনরায় তাদের অনুসারীদের নিয়ে মিছিলের আয়োজন করেন। বুধবার সন্ধ্যায় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের নেতৃত্বে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সমর্থকরা তাদের দুই থেকে আড়াইশ অনুসারী নিয়ে চন্দ্রগঞ্জ বাজারে আনন্দ মিছিল বের করে। এদিকে একই সময় চলমান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী সোলায়মানের নেতৃত্বে তারাও দুই তিন'শ কর্মী সমর্থক নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে।

চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সমর্থকরা মিছিল শেষ তারা আফজাল রোডের মোড়ে জড়ো হয়ে বক্তৃতা করেন। এসময় চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম মান্দ্রুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পূর্বের কমিটির অনুসারীরা দলবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আফজাল রোডের মোড় হয়ে বাজারের দিকে আসতে চাইলে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল বিনিময় হয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে তাদের উভয়পক্ষকে নিভৃত করতে গিয়ে দুই পক্ষের লোকজনের ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হন। সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া গোলাম ফারুক পিংকু জানান, চন্দ্রগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি চিঠি দেয়। পরে সেই চিঠিকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হয়। পরে রাতে সেই ঘটনায় উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে দেখা হচ্ছে।  

ওসি মো. তহিদুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ও মারধরের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।


একাত্তর/আরবিএস