আর ক’দিন পরেই জীবনের ৭৫ বছর পূর্ণ করবেন বাংলা আধুনিক গানের বাঁক বদলকারী সংগীতকার কবীর সুমন। তার মাস খানেক আগে সোমবার ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়ে সংগীতকার জানালেন শেষ জীবনে তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান।
বাংলাদেশে থাকতে সাহায্যও চেয়েছেন দুই বাংলায় তুমুল জনপ্রিয় এই শিল্পী।
ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি মারা গেলে যেন তার মরদেহ বাংলাদেশেরই কোনো হাসপাতালে কাজে লাগানো হয়।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, “এই কথা আমি আগেও অনেক বার বলেছি। তাও ফের বলছি কারণ আমার কথায় কোনও কাজ হচ্ছে না। এমন নয় যে সনাতনধর্মীয় নামধারী কোনও বঙ্গজ আমায় সম্মান করেন না। মুষ্টিমেয় কিছু বঙ্গজ করেন। কিন্তু বড্ড বেশি সংখ্যক সনাতনধর্মীয় বঙ্গজ আমায় ঢাক পিটিয়ে ঘৃণা করেন, এবং তা জাহির করে সনাতনী সুখ পান। আর এক শ্রেণীর সনাতন-বঙ্গজ আছে যারা আমায় কবীর নামে ডাকতে চায় না। এরা, যা দেখেছি ‘বামপন্থী’। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আমার নাম ভারতের সংবিধান মোতাবেক, ঘোষিতভাবে কবীর সুমন। ফার্স্ট নেম কবীর। সারনেম সুমন।
আমার আয়কর ফাইল, র্যাশন কার্ড, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি, আধার কার্ড সর্বত্র এই নামটাই আছে। এই নামে আমি ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে লড়ে মাননীয় সিপিআইএম সদস্য ডক্টর সুজন চক্রবর্তীকে হারিয়ে দিয়ে লোকসভার সাংসদ হয়েছিলাম। ভারতের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম বাংলায় তা সকলের জানার কথা। তা সত্ত্বেও সিপিআইএম করা বঙ্গজরা আমায় আমার বর্জিত নামে ডাকেন। শুধরে দিলেও শুধরে নেন না। আর নকশালপন্থী দলের বঙ্গজ নেতাও (নামে সনাতনধর্মীয়) আমায় ভুলেও কবীর সুমন বলেন না, কবীর তো নয়ই। তিনি অবিরাম সুমন সুমন করে যান। এদিকে সকলেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার, ব্যক্তিগত অধিকার বলতে গদগদ। আর একদল আছে, যারা আমায় গানওলা বলে ডাকে। কী বলি।
যা বুঝেছি, আমায় নির্দ্বিধায় সম্মান করেন যারা, প্রাপ্য সম্মানটুকু দেন যারা তারা সদলবলে বাংলাদেশের নাগরিক। পশ্চিমবঙ্গের সনাতনধর্মীয় বঙ্গজদের মতো বাংলাদেশের কেউ আমায় সমানে, যে কোনও উপায়ে অপমান করে যান না।
আর মাসখানেক পরে আমি ৭৫ পুরো করে ৭৬-এ পড়ব। কলকাতা আমার প্রথম প্রেম। কলকাতা নামটা আমার গানে যতবার এসেছে আর কারোর কবিতায় গানে তা আসেনি। আমায় যারা বাঁচিয়ে রেখেছেন তারা সকলেই কলকাতার সনাতনধর্মীয় বঙ্গজ। তাদের ছেড়ে থাকতে পারব না। কিন্তু, কারোর কোনও ক্ষতি না করা সত্ত্বেও সমানে অপমানিত হতে হতে এবারে আমি চাইছি এই দেশটা, মায় এই শহরটাও ছেড়ে চলে যেতে। এখানকার সনাতনধর্মীয় বঙ্গজদের মধ্যে অন্তত দুজন ফেসবুকে ঘোষণাও করেছেন ‘হাসপাতাল থেকে ফিরে না এলেই ভালো হত’। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু লেখেনি।”
সুমন লিখেছেন, “আমার শেষ জীবন আমি যদি বাংলাদেশে থেকে আমার মাভাষার সেবা করতে পারতাম, বাংলা খেয়াল শেখাতে পারতাম আমার আজকের স্বাস্থ্য যতটা অনুমতি দেবে ততটা অন্তত। আমি এগনোস্টিক (অজ্ঞেয়বাদী)। মরে যাবার পর কোনও ধর্মীয় শেষকৃত্যের প্রশ্নই উঠবে না। আমার দেহ দান করা আছে। বাংলাদেশে মরলে সেখানকার কোনও হাসপাতালে আমার শরীর কাজে লাগানো যেতে পারে।
আজও আমি ফেসবুকে আমার সম্পর্কে সনাতনধর্মীয় বঙ্গজদের খিস্তি পড়েছি। এতে আমার মধ্যে কোনও উত্তেজনা জাগেনি। জাগছে এই ‘বিদেশটা’ ত্যাগ করে ভাষা মতিনের দেশে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, সেই দেশের কাজে লাগার ইচ্ছে। প্রকাশ্যে সাহায্য ও আশ্রয় চাইছি। এই রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে বাংলা খেয়ালকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, রাজ্য ক্লাসিকাল মিউজিক কনফারেন্সে আমায় বাংলা খেয়াল গাইতে দিয়েছেন। এ রাজ্যের একজন শিল্পীও কিন্তু সংহতি জানাননি আমার সঙ্গে। যতদিন বেঁচে থাকব শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, তার পক্ষে থাকব।
কেউ যদি পারেন আমায় সাহায্য করুন।
জয় বাংলা, জয় বাংলা খেয়াল!”
গেলো গত ২৯ জানুয়ারি শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বাংলা আধুনিক গানকে নতুন এক দিশা দেখানো ৭৫ বছর বয়সী কবীর সুমন। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার বাড়িতে ফেরেন তিনি।
এখন নতুন গানের অ্যালবাম বের না করলেও বাংলা খেয়াল গান নিয়ে মেতে আছেন। যাকে শিল্পী নিজেই বলেছেন তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ কাজ’। সাড়া জাগানো অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ ছাড়াও, ‘বসে আঁকো’, ‘ইচ্ছে হল’, ‘গানওয়ালা’, ‘ঘুমাও বাউন্ডুলে, ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’, ‘জাতিস্মর’, ‘পাগলা সানাই’, ‘যাব অচেনায়’, ‘নাগরিক কবিয়াল’, ‘আদাব’সহ আরও কিছু অ্যালবাম সুমন প্রকাশ করেছেন গত তিন দশক ধরে।
শৈশবে বাবা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মা উমা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সংগীতের হাতেখড়ি সুমনের। খেয়ালের তালিম নেন সংগীত শিক্ষক কালীপদ দাসের কাছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া কবীর সুমন একসময়ে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক বাংলা গান গাইতেন রেডিওতে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা করা এই শিল্পী জীবনের শুরুর দিকে কাজ করেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে এবং পরে ভয়েস অব আমেরিকা এবং ডয়চে ভেলেতে।
গানের অ্যালবাম ছাড়াও সুমন বেশি পরিচিত হন তার কনসার্টগুলোয়। গিটার, পিয়ানো, মাউথঅর্গান বাজিয়ে গান গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথনে সুমনের জুড়ি মেলা ভার।
সুমন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনাও। কলকাতার নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় ‘জাতিস্মর’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার জন্য সুমন পান জাতীয় পুরস্কার।
একসময় স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন তিনি। নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুর আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পাশে। তারপর যাদবপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে এমপি হন। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পরে তৃণমূল ছাড়েন সুমন। পরে সেই দূরত্ব কমেও যায়। নিজেকে মমতার সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।
গত বছরের নভেম্বরে সর্বশেষ ঢাকায় আসেন কবীর সুমন। তখন চার দিনের বাংলা খেয়াল কর্মশালার জন্য ঢাকায় আসেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তার প্রথম আধুনিক গানের অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশ হয় ১৯৯২ সালে। বাংলা গানের গতিপথ বদলে দেওয়া এ অ্যালবাম প্রকাশের ৩০ বছর পূর্ণ হয় ২০২২ সালে। এ উপলক্ষে ঢাকায় ‘তোমাকে চাই-এর ৩০ বছর উদ্যাপন’ শিরোনামে গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেন এই সংগীতকার। বাংলা খেয়াল নিয়ে আলাদা একটি অনুষ্ঠানও করেন তিনি।
ওই অনুষ্ঠানে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে কবীর সুমন বলেছিলেন, ‘আমার একটা অসুখ হয়েছে, এই অসুখের কারণে আমি যেমন হাতে লিখতে পারি না, তেমনই গিটারও বাজাতে পারি না। আর কোনো দিন পারবো না। একটানা বসে থাকলেও সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় শুয়ে শুয়ে গান গাই! তবে এ জন্য আমার আলাদা কোনো দুঃখ নেই। গুরুদের কৃপায় আমি এখনো একটু একটু গান গাইতে পারি, এটাই আনন্দ।’
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আয়োজিত কনসার্টে প্রথম ঢাকায় আসেন সুমন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় এসে অনুষ্ঠান করে গেছেন এই শিল্পী।