আধুনিক বাংলা গানের জগতের কিংবদন্তি কবীর সুমনের জন্মদিন আজ। দিন যাপনের স্রোতে জীবনের ৭৫ বসন্তে পা রেখেছেন তিনি। জীবনের বিশেষ দিনটিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের ভালোবাসা আর শুভেচ্ছায় ভেসে যাচ্ছেন সুমন।
কবীর সুমনের অনেক পরিচয়। একজন বাঙালি গায়ক, গীতিকার, অভিনেতা, বেতার সাংবাদিক, গদ্যকার এবং রাজনীতিবীদ সুমন।
কবীর সুমন ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ ভারতের উড়িষ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ব নাম সুমন চট্টোপাধ্যায়। তার পিতা সুধিন্দ্রনাথ এবং মাতা উমা চট্রোপাধ্যায়।
খুব অল্প বয়সেই বাবার তত্ত্বাবধানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন সুমন। আচার্য কালীপদ দাস ও চিন্ময় লাহিড়ী তাকে খেয়াল শিখিয়েছিলেন। তিনি কলকাতার সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতক লাভ করেন এবং ফরাসি ভাষা ও জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা করেন।
সুমনের গান যে আলাদা, সেটি বুঝতে সঙ্গীতবোদ্ধা হতে হয় না। সাধারণত নিজের গান নিজেই লিখেন, নিজেই সুর করেন। শিল্পী জীবনের প্রথম পর্যায়ে সুমন ‘নাগরিক’ নামের কলকাতার একটি ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন।

সুমন মূলত ভক্তদের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন তার জীবনমুখী গানের জন্যই। কোনো ইন্সট্রুমেন্টের বাড়াবাড়ি বা প্রযুক্তির কারসাজি নেই তার গানে। অসম্ভব সুন্দর গানের কথা, প্রত্যেকটা গানই শ্রোতাকে তার বিস্ময়ের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুমন নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘গান লেখার জন্য কল্পনা করার প্রয়োজন নেই, তোমার আশে পাশের পরিবেশ নিয়েই গান ধরো। আত্ম শুদ্ধির স্বাদ পাবে।’ এই জন্যই হয়তো সুমনকে বলা হয়ে থাকে নাগরিক কবিয়াল।
১৯৯২ সালে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। তার স্বরচিত গানের অ্যালবামের সংখ্যা পনেরো। সঙ্গীত রচনা, সুরারোপ, সঙ্গীতায়োজন ও কণ্ঠদানের পাশাপাশি গদ্যরচনাও তিনি স্বকীয় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধিক প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছোট গল্পের রচয়িতা।
প্রথম জীবনে রেডিও জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন ডয়েচ ভেলে-তে, কাজ করেছেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে।
বাংলাদেশের প্রতি সুমনের প্রাণের টান ফিকে হয়ে যায়নি কখনো। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ফেলানী-হত্যার বিচার, রাজাকার বিরোধী আন্দোলনের সময় খুন হওয়া ব্লগার রাজীব হত্যার বিচার, নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে গান করাসহ বাংলাদেশের বহু প্রসঙ্গ নিয়েই সুমন গান করেছেন।
কবীর সুমনের সৃষ্ট গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- গানওয়ালা, তোমাকে চাই, তুমি ছিলে, হাল ছেড়ো না বন্ধু, অভিবাদন, খোদার কসম জান, জাতিস্মর, কখনো সময় আসে, সাড়া দাও ইত্যাদি।
এখন নতুন গানের অ্যালবাম বের না করলেও বাংলা খেয়াল গান নিয়ে মেতে আছেন। যাকে শিল্পী নিজেই বলেছেন তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ কাজ’। সাড়া জাগানো অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ ছাড়াও, ‘বসে আঁকো’, ‘ইচ্ছে হল’, ‘গানওয়ালা’, ‘ঘুমাও বাউন্ডুলে, ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’, ‘জাতিস্মর’, ‘পাগলা সানাই’, ‘যাব অচেনায়’, ‘নাগরিক কবিয়াল’, ‘আদাব’সহ আরও কিছু অ্যালবাম সুমন প্রকাশ করেছেন গত তিন দশক ধরে।
গানের অ্যালবাম ছাড়াও সুমন বেশি পরিচিত হন তার কনসার্টগুলোয়। গিটার, পিয়ানো, মাউথঅর্গান বাজিয়ে গান গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথনে সুমনের জুড়ি মেলা ভার।
সুমন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনাও। কলকাতার নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় ‘জাতিস্মর’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার জন্য সুমন পান জাতীয় পুরস্কার।

একসময় স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন তিনি। নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুর আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পাশে। তারপর যাদবপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে এমপি হন। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পরে তৃণমূল ছাড়েন সুমন। পরে সেই দূরত্ব কমেও যায়। নিজেকে মমতার সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।
২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ ঢাকায় আসেন কবীর সুমন। তখন চার দিনের বাংলা খেয়াল কর্মশালার জন্য ঢাকায় আসেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তার প্রথম আধুনিক গানের অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশ হয় ১৯৯২ সালে। বাংলা গানের গতিপথ বদলে দেওয়া এ অ্যালবাম প্রকাশের ৩০ বছর পূর্ণ হয় ২০২২ সালে। এ উপলক্ষে ঢাকায় ‘তোমাকে চাই-এর ৩০ বছর উদ্যাপন’ শিরোনামে গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেন এই সংগীতকার। বাংলা খেয়াল নিয়ে আলাদা একটি অনুষ্ঠানও করেন তিনি।
ওই অনুষ্ঠানে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে কবীর সুমন বলেছিলেন, ‘আমার একটা অসুখ হয়েছে, এই অসুখের কারণে আমি যেমন হাতে লিখতে পারি না, তেমনই গিটারও বাজাতে পারি না। আর কোনো দিন পারবো না। একটানা বসে থাকলেও সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় শুয়ে শুয়ে গান গাই! তবে এ জন্য আমার আলাদা কোনো দুঃখ নেই। গুরুদের কৃপায় আমি এখনো একটু একটু গান গাইতে পারি, এটাই আনন্দ।’
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আয়োজিত কনসার্টে প্রথম ঢাকায় আসেন সুমন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় এসে অনুষ্ঠান করে গেছেন এই শিল্পী।
