রাশিয়ার মস্কোতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। এরিমধ্যে হামলাকারীদের পাকড়াও করে আদালতে তুলে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। অন্যদিকে হামলায় নিহতদের স্মরণে এখনো রাশিয়া জুড়ে শোকের ছায়া। বেঁচে ফেরাদের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতঙ্ক।
তবে ঘটনার পর থেকে এক কিশোর এখন দেশটির জাতীয় বীর। তার কথা মুখে মুখে ফিরছে। শুধুমাত্র বুদ্ধি আর সাহসের সমন্বয় ঘটিয়ে এক একশ’ মানুষের জীবন বাঁচিয়ে কিশোরটির নাম এখন সবার মুখে। শতাধিক মানুষকে ওই অভিশপ্ত শুক্রবার সন্ধ্যায় সিটি হল থেকে বেরোতে সাহায্য করে সে।
এই রুশ কিশোরের নাম ইসলাম খালিলভ। বয়স মাত্র ১৫। অথচ রাশিয়ার জঙ্গি হামলায় কমপক্ষে একশ’রও বেশি সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে তিনিই এখন খবরের শিরোনামে। তার সেই নাটকীয় কাহিনি জানাজানি হতেই প্রশংসার ঢল নেমেছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। আর রুশদের কাছে তিনি রীতিমতো বীর!
বিভিন্ন রুশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মস্কোর উপকণ্ঠে ক্রাসনোগর্স্কের ক্রোকাস সিটি মল ও কনসার্ট হলের একটি স্টোররুমে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতো ইসলাম। সে সুবাদে কনসার্টের ভেতরে অলিগলি-প্যাসেজ-সিঁড়ি সবই নখদর্পণে ছিলো তার। আর সেই বিষয়টিকেই বিপদের সময় কাছে লাগিয়েছেন তিনি।
কাজের প্রশিক্ষণ হিসেবে আপৎকালীন পরিস্থিতি হলে কী করতে হবে- সেটাও শেখানো হয়েছিল তাকে। শুধুমাত্র উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসের কারণে সেই প্রশিক্ষণ ও নিজের জ্ঞানবুদ্ধি দিয়েই শতাধিক মানুষকে ওই অভিশপ্ত সন্ধ্যায় কনসার্ট হরের ভেতর থেকে বেরুতে সাহায্য করে ইসলাম খালিলভ।
গেলো শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ জনপ্রিয় রুশ ব্যান্ড ‘পিকনিক’ -এর কনসার্ট শুরু হবার ঠিক আগে ভিড়ে ঠাসা ক্রোকাস সিটির কনসার্ট হলে হামলা চালায় সশস্ত্র বন্দুকবাজের একটি দল। এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে একাধিক জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়েও অনেকে প্রাণ হারান।
ইসলাম সেদিন ওই প্রেক্ষাগৃহের স্টোরের দায়িত্বে ছিলো।
তিনি বলেন, হঠাৎ লাগাতার গুলির শব্দ হতেই বুঝতে পারি, কিছু একটা বিপদ হয়েছে। হঠাৎ দেখি, হুড়মুড়িয়ে লোকজন বেরিয়ে আসছে। আমি চটপট তাদের ইশারা করতে থাকি, বলি কোনদিকে গেলে বেরুনো নিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাজের শুরুতেই এ নিয়ে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল। সেটা এভাবে কাজে আসবে, ভাবিনি। একাধিক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, সে তারস্বরে ভীত, সন্ত্রস্ত মানুষদের এক্সপোর দিক দিয়ে বাইরে যাওয়ার রাস্তা দেখাচ্ছে। চিৎকার করে করে সে সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ইসলাম সেই কথা মনে করে বলেন, আমি ঠিক করেছিলাম, আমি সবার শেষে থাকব। যাতে কেউ বাদ না পড়ে যান, বা আটকে না থাকেন। ততক্ষণে আগুন জ্বলে উঠেছে একাধিক জায়গায়। কিন্তু কিশোর ইসলামের তৎপরতায় প্রাণে বেঁচেছেন অন্তত একশ’র বেশি মানুষ।
তবে ইসলাম মনে করেন তিনি কোনও নায়কোচিত কাজ করেনি। তার ভাষায়, সত্যি বলছি, আমি কোনও নায়কের কাজ করিনি। শুধু নিজের দায়িত্বটুকু করেছি। বিপদে মানুষের প্রাণ বাঁচানোটাই তো উচিত। সঙ্গে এও জানান, সব শুনে খুবই ভয় পেয়েছেন তার মা। তিনি নিজেও একজনকে গুলি চালাতে দেখেছেন।
সেদিনেই সেই সাহসিকতার স্বীকৃতিও পেয়েছেন ইসলাম। ইতিমধ্যেই রুশ শিশু ও কিশোর অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক ‘ওম্বাডসম্যান’ মারিয়া লভোভা বিলোভা তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে পুরস্কৃত করেছেন। ইসলাম খালিলভের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে সাহসিকতার পদক ও সনদ।