ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কেরালার তিরুবনন্তপুরম আসনে রেকর্ড চতুর্থ মেয়াদে জয় পেয়েছেন কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা শশী থারুর। বিজেপির রাজীব চন্দ্রশেখরকে তিনি হারিয়েছেন ১৬ হাজার ৭৭ ভোটে।
শশী থারুর পেয়েছেন তিন লাখ ৫৮ হাজার ১৫৫ ভোট। আর বিজেপির রাজীব চন্দ্রশেখর পেয়েছেন তিন লাখ ৪২ হাজার ৭৮ ভোট।
দেশটির নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ফল ঘোষণা করা ২৪০টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি- বিজেপি পেয়েছে ১২২টি আসন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পেয়েছে ৫৩টি আসন। সমাজবাদী আসন পেয়েছে ১৫টি আসন এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস ছয়টি আসন পেয়েছে।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে থারুর বলেন, চতুর্থবারের জন্য এটি এক আশীর্বাদ। ভোটারদের বিশ্বাসের যোগ্য হওয়ার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে, কিন্তু সুপার ওভার ছিলো তিরুবনন্তপুরমে। বিজেপি ব্যাপক লড়াই করেছে।
এটি বিজেপির জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা জানিয়ে থারুর আরও বলেন, কেরালায় সাম্প্রদায়িক প্রচার খুব বেশিদূর যাবে না।
এদিকে বিজেপির রাজীব চন্দ্রশেখর হারের পর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এটা হতাশাজনক। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমরা খুব ইতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছি। তিন লাখ ৪০ হাজার মানুষ আমাদের সমর্থন করেছে, যা একটি রেকর্ড সংখ্যা।
তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমরা সঠিক পথে আছি। তবে আমি জিততে না পারায় হতাশ হয়েছি। তিরুবনন্তপুরম এবং এর জনগণের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি অবিচল রয়েছে।
কংগ্রেস নেতা থারুর এই আসনে ২০০৯ থেকে টানা জয়ের ধারা বজায় রেখেছেন।
শশী থারুর ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। থারুরের বয়স যখন দুই বছর তখন তার বাবা-মা ভারতে ফিরে আসেন। তিনি ১৯৬২ সালে দক্ষিণ ভারতের ইয়ারকাউডের মন্টফোর্ট স্কুল ভর্তি হন, পরে বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে যান এবং ক্যাম্পিয়ন স্কুলে পড়াশোনা শেষ করেন।
এ ইতিহাস বিষয়ক লেখক ১৯৭৫ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেন কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক পাস করেন। সেসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন এবং সেন্ট স্টিফেনস কুইজ ক্লাবও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একই বছরে থারুর মেডফোর্ডের টাফ্টস ইউনিভার্সিটির দ্য ফ্লেচার স্কুল অফ ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমএ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান।
১৯৬৭ সালে এমএ পাস করার পর, থারুর আরও ১৯৭৭ সালে আইন ও কূটনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরেট করার সময় থারুর তার কৃতিত্বের জন্য রবার্ট বি. স্টুয়ার্ট পুরস্কারে ভূষিত হন এবং ফ্লেচার ফোরাম অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রথম সম্পাদকও নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ফ্লেচার স্কুলের ইতিহাসে ডক্টরেট প্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি, যিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭৮ সালে জেনেভায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের স্টাফ সদস্য হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন থারুর। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান ছিলেন। ১৯৯৬ সালে থারুরকে যোগাযোগ ও বিশেষ প্রকল্পের পরিচালক এবং মহাসচিব কফি আনানের নির্বাহী সহকারী নিযুক্ত করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে তিনি জাতিসংঘে তার দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ করেন এবং রাজনীতিতে যোগ দেন।
থারুর একবার বলেছিলেন, ২০০৮ সালে তিনি যখন তার রাজনীতিতে আসেন তখন কংগ্রেস, কমিউনিস্ট এবং বিজেপি তার সাথে যোগাযোগ করেছিল। তিনি কংগ্রেসকে বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি এতে আদর্শিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের মার্চ মাসে তিনি কেরালার তিরুবনন্তপুরমে কংগ্রেস পার্টির প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখন পর্যন্ত এ আসনে তাকে কেউ হারাতে পারেনি।
রাজনীতির পাশাপাশি শশী থারুর ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা যেমন নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান প্রভৃতিতে কলামিস্ট এবং লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন। তার লেখা বহু বই বিভিন্ন ভাষায় দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে।