বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যে হাড্ডহাড্ডি টক্করের আভাস

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ‘সুপার পাওয়ার’ যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরেই অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এরমধ্যেই এই নির্বাচনের জন্য দেশটির দুই প্রধান দলের প্রার্থীও চূড়ান্ত। ডেমোক্রাটিক পার্টির হয়ে লড়বেন জো বাইডেন। আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ শুরুর আগে প্রধান দুই প্রার্থীর বিতর্কে মুখোমুখি হবার রেওয়াজ রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বুড়ো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম বিতর্কে মুখোমুখি হতে চলেছেন। ট্রাম্পের বয়স ৭৮ আর বাইডেনের ৮১। 

এই বিতর্কে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দুই নেতার অবস্থানের ওপর নজর থাকবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। অন্যদিকে মার্কিন নাগরিকদের নজরে থাকবে দুই প্রার্থীর মধ্যে কে কাকে কতটা ঘায়েল করতে পারলেন সেই দিকে। পূর্বাভাস বলছে, প্রথম বিতর্কে বাইডেনকে কঠিন সময় দিবেন ট্রাম্প। 

নির্বাচনের আগে দুটি মুখোমুখি বিতর্কের বিষয়ে একমত হয়েছেন বাইডেন ও ট্রাম্প। এই দু’টোর আয়োজক সিএনএন ও এবিসি। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় সিএনএনের আটলান্টা স্টুডিওতে প্রথম বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকাল ৭টা। আর দ্বিতীয় বিতর্কটি হবে ১০ সেপ্টেম্বর।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান ও সাবেক প্রেসিডেন্টের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনা বিরল। আমেরিকা ফার্স্ট বা ‘সবার আগে আমেরিকা’ প্রচার চালিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প তার ২০১৭-২১ মেয়াদে অনেকটাই বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নীতি নেন। অন্যদিকে বৈশ্বিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার করে ‘আমেরিকার প্রত্যাবর্তন’ স্লোগান নিয়ে ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসেন বাইডেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট ৮১ বছর বয়সী জো বাইডেন এবং তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান দলের ৭৮ বছর বয়সী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতোদিন দূর থেকে একে অপরকে বাক্যবাণ ছুড়েছেন। এবার তাদের মুখোমুখি হবার পালা। 

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে থাকার এই সময়ে জনমত জরিপগুলোতে বাইডেন-ট্রাম্পের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই মুখোমুখি বিতর্কে নামছেন তারা। উন্নত প্রযুক্তির একাধিক ক্যামেরার সামনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী একে অপরকে ঘায়েলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। 

তাদের বিতর্কের প্রধান প্রধান বিষয় হয়ে উঠতে পারে মার্কিন অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিদেশে চলমান যুদ্ধ, অভিবাসন; এমননি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের বিষয়ও। একের অপরের ব্যর্থতাকে সামনে এনে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করতে পারেন। আর দেশটির নাগরিকরাও চাইছেন একটি জমজমাট কথার লড়াই। 

অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তারা মুখ ফসকে ভুল কিছু বলে ফেললে বা আমতা আমতা করলে তা জনমনে তাদের বয়স নিয়ে উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে উল্টেপাল্টে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ। বাইডেনের থেকে তিন বছরের ছোট ট্রাম্প। ফলে দুজনের বয়সই বলতে গেলে সমান।

কিছু মৌলিক বিষয়ে বাইডেন ও ট্রাম্প দুজনেরই অবস্থান অভিন্ন। যেমন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার বিষয়ে দুই প্রেসিডেন্টের অবস্থানই ছিলো অনমনীয়। তারা মনে করছিলেন যে দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মার্কিনদের রক্তক্ষয় ও অর্থ ব্যয়ের কোনো মানে নেই। 

তবে জনমত জরিপগুলোতে দেখা যায়, ট্রাম্পের তুলনায় বাইডেনের বয়স নিয়েই মানুষ বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ ট্রাম্প যদি নির্বাচনে জেতেন, তাহলে তার মেয়াদ শেষের আগেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন। তারপরও এক্ষেত্রে বাইডেনের তুলনায় এগিয়ে আছেন ট্রাম্প।

তবে অধিকাংশ বিষয়ে দুই নেতার অবস্থান দুই দিকে। এবং সেগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে পরস্পরের সমালোচনা করে আসছেন দুজন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রশাসন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হবার সহায়তার দরজা খুলে রেখেছেন বাইডেন। 

তবে ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তিনি মনে করেন, যুদ্ধে রাশিয়া জিতবে। তাই ইউক্রনকে লাগামহীন সহায়তার পক্ষে তিনি নন। মার্কিন জনগণের করের টাকায় এ ধরনের সহায়তা অর্থনীতিতে ভোগাবে। প্রেসিডেন্ট হলে এ যুদ্ধ বন্ধ করার সামর্থ্য রাখেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকাল ইসরাইলকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে যান ট্রাম্প। তিনি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং মার্কিন দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নেন। পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চান ফিলিস্তিনিরাও।

বাইডেনও নিজেকে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দাবি করে আসছেন। তবে গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনি হত্যার ঘটনায় দুই হাজার পাউন্ড ওজনের বোমার একটি চালান আটকে দেয়া নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বাইডেনের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়।

চীন, উত্তর কোরিয়া ও তাদের মিত্রদের বিষয়ে ট্রাম্প ও বাইডেনের অবস্থান অভিন্ন। তবে, চীনের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের মাত্রাগত কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। চলে আসতে পারে তাইওয়ান প্রসঙ্গ। আর নিশ্চিতভাবেই উঠতে পারে মধ্যপ্রচ্য আর আফ্রিকা নিয়ে মার্কিন নীতি। 

যুক্তরাষ্ট্রের নির্দলীয় বিতর্ক আয়োজক কমিশন সিপিডি  ১৯৮৮ সাল থেকে নির্বাচনে বিতর্কের আয়োজন করে আসছে। এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার প্রথম বিতর্কের আয়োজন করেছে সিএনএন। দ্বিতীয় বিতর্কের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১০ সেপ্টেম্বর। এবিসি ওই বিতর্কের আয়োজন করেছে।