কলকাতায় এখনও চলছে ধরপাকড়, টাস্কফোর্স গঠনে আদালতের নির্দেশ

আর জি কর'কাণ্ডে কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল ও ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবারও কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিরোধী কংগ্রেস ও আইএসএফ বিক্ষোভ মিছিল করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। 

মঙ্গলবার দুপুরে কলকাতা পুলিশের হেড কোয়ার্টার লালবাজারে বিক্ষোভ করে কংগ্রেস কর্মীরা। এসময় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করে। 

আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো বলেন, যারা দোষী, তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে এটাই আমাদের দাবি ছিলো। 

অন্যদিকে নিহত চিকিৎসকের পরিবার রাজ্য, দেশ, সুপ্রিমকোর্ট ও হাই কোর্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। তবে তাদের অভিযোগ, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা হয়েছে। এ জন্য প্রশাসনকে দায়ী করছেন তারা। তারা বলেন, আমরা সিবিআইকে সমস্ত তথ্য দিয়েছি। রাজ্যপালের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। রাজ্যপাল বলেছেন, বিচার আমরা পাবো। সিবিআই আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে। দোষীরা ধরা পড়বে। আর তারা আমাদের মেয়ের মৃত্যুর বিচার করবে।

এদিকে চিকিৎসকদের সুরক্ষায় জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। নজিরবিহীন চিকিৎসক হত্যাকাণ্ডে রাজ্য পুলিশ থেকে তদন্তের ভার আগেই সিবিআই এর হাতে গেছে। হাইকোর্টে এই মামলা চলার মাঝেই, দেশের শীর্ষ আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই মামলায় হস্তক্ষেপ করে। মঙ্গলবার ভারতের শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানি ছিলো। 

rg kar

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটার কিছু পরেই শুরু হয় শুনানি। প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি জেবি পর্দিওয়ালা ও বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চে ঘটনার শুনানি ছিলো এদিন। প্রধান বিচারপতি সবার আগে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ঘটনা প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নিহত চিকিৎসকের পরিচয় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়া নিয়েও। প্রশ্ন ওঠে হাসপাতালের অধ্যক্ষ এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে।

মঙ্গলবারের শুনানিতে বিষয়টি উত্থাপন করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। রাজ্যের পক্ষ থেকে এদিন সওয়াল করেন আইনজীবী কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভিসহ অন্য আইনজীবীরা।

শুনানির শুরু থেকেই রাজ্য প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে সুপ্রিম কোর্ট। ১৪ আগস্টের মধ্যরাতে আর জি কর হাসপাতালে বহিরাগতদের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মঙ্গলবার রাজ্য সরকারকে চরম ভর্ৎসনা করে সুপ্রিম কোর্ট।

সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ক্রাইম সিন সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বলেন, আমরা খুবই চিন্তিত। প্রতিবাদকারীদের বাধা দিতে বলপ্রয়োগ করে রাজ্য। আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, স্বাধীনতা দিবসের দিন রাজ্য কীভাবে হাসপাতাল ভাঙচুর করতে দিলো? 

rg kar

এদিন প্রধান বিচারপতি একাধিক প্রশ্ন তোলেন। জানতে চান, ঘটনার দিন প্রিন্সিপাল কী করছিলেন? এফআইআর করা হয়নি কেন? বাবা-মায়ের হাতে মৃতদেহ তুলে দিতে এত দেরি হলো কেন? পুলিশ কী করছিলো? হাসপাতালের মতো জায়গায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সবাই কী করছিলো?

পাশাপাশি, দেশের চিকিৎসক মহলের ওপর বারবার যে হামলার ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে গভীর চিন্তা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের কথায়, চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা যেন সহজেই হামলার শিকার হচ্ছেন। নারী স্বাস্থ্যকর্মী এবং ডাক্তাররা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে, তাই দেশ আরও একটা ধর্ষণের ঘটনার অপেক্ষা করবে না কিছু পরিবর্তন আনার জন্য।  

এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে একটি সুপারিশ কমিটি গঠন করেছে সর্বোচ্চ আদালত। এই টাস্কফোর্স ডাক্তারদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এবং অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত নিয়মবিধি রূপায়ণে একটি সুপারিশ জমা দেবে। টাস্ক ফোর্সে থাকবেন ৯ জন চিকিৎসক। সুপ্রিমকোর্ট টাস্কফোর্সকে তিন সপ্তাহের মধ্যে অন্তর্বর্তী রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে ৬০ দিনের মধ্যে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, এই ঘটনাটি মাত্র একটি হাসপাতালে নির্দিষ্ট একটি ধর্ষণের বিষয় আর নেই। দেশজুড়ে তামাম ডাক্তারদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত ব্যবস্থাগত সম্পর্ক জড়িয়ে গিয়েছে। দেশ জুড়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ 

প্রতিটি হাসপাতালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার।
নারী এবং পুরুষ চিকিৎসকদের পৃথক বিশ্রামাগার থাকতে হবে।
নার্সদের আলাদা রুম দিতে হবে।
প্রত্যেক হাসপাতালে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে হবে।
প্রতিটি হাসপাতালের করিডোরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে।
পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো লাগাতে হবে।
হাসপাতালের নিরাপত্তায় কোনো গাফিলতি চলবে না।
সব হাসপাতালে নির্দিষ্ট অভিযোগ বাক্স রাখতে হবে, যা সর্বক্ষণ সচল থাকবে।

শিক্ষানবিশ নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় স্বপ্রণোদিত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় মঙ্গলবার স্পষ্ট বলেন, দেশ আরও একটা ধর্ষণের ঘটনার অপেক্ষা করবে না। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে সিবিআই এর কাছ থেকে স্ট্যাটাস রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত।

শীর্ষ আদালত বলেছে, আমরা চাই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সিবিআই আমাদের অবহিত করুক। প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় এদিন তার নির্দেশে বলেছেন, আর কাউকে এখন রিপোর্ট দিতে হবে না। আমাদের কাছেই তা পেশ করবেন। 

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে আর জি কর'কাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল সিবিআই। এদিন সুপ্রিম কোর্টে নির্দেশের পর স্পষ্ট যে, মামলাটি এবার সর্বোচ্চ আদালতের অধীনেই চলে গেলো। 

একইসঙ্গে আর জি কর হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য এদিন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। 

কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে শিক্ষানবিশ নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ভারতজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। গত ১৪ অগস্ট স্বাধীনতার মধ্যরাতে পথে নেমে প্রতিবাদ জানান আমজনতা।

সেই রাতেই হাসপাতালে ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটে। ভেঙে তছনছ করে দেয়া হয় আর জি করের জরুরি বিভাগ, হুমকি দেয়া হয় নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের। তারপর থেকেই প্রতিবাদ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার এ মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা দেয়ার কথা জানালো শীর্ষ আদালত। একইসঙ্গে, প্রধান বিচারপতি চিকিৎসকদের কাজে ফেরার বার্তাও দিয়েছেন। 

ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বলেন, আমরা আর জি কর হাসপাতালে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছি। চিকিৎসকেরা যাতে আবার কাজে ফিরতে পারেন, তাই এমন সিদ্ধান্ত বলে জানায় শীর্ষ আদালত। আর জি করে সিআইএসএফ মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

এদিকে আন্দোলনরত চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আমাদের রক্ষা করবে, আমরা সেই অর্ডারটা দেখতে চাইছি। কতদিন এই নিরাপত্তা থাকবে সেটা আমরাও জানতে চাই। তার কারণ এখন পর্যন্ত একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আমরা জানি, একাধিক ব্যক্তি এই ঘটনায় জড়িত রয়েছে। তবে তারা কেন এখনও ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে? তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না?

অন্যদিকে একসময় মমতার রাজ্য সরকার এ ঘটনায় সরকার ঘনিষ্ঠ আর জি করের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়ালেও মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কার্যত রক্ষাকবচ তুলে নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। 

কলকাতা পুলিশ সূত্রে খবর, সন্দীপের বিরুদ্ধে ‘প্রিভেনশন অব করাপশন’ আইনের ধারায় মামলা হয়েছে। প্রাক্তন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক সময়ে ওঠা নানান দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে রেখে সোমবারই সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি তৈরি করেছিলো রাজ্য। তার একদিন পরেই আবার মামলা কলকাতা পুলিশের।

বিরোধীদের অভিযোগ সন্দীপের বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ থাকলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সিবিআই তদন্তে নামতেই পুলিশের টনক নড়েছে। সিবিআই আর জি কর হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার হাতে নেয়ার পর থেকে একটানা পাঁচদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিবিআই এর জেরার মুখে পড়েছেন সন্দীপ ঘোষ।