কাবেয়োর বিশাল শক্তিকে কতটা বাগে আনতে পারবেন রদ্রিগেজ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি হওয়ার পরবর্তী ১২ দিনে, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে তিনি মার্কিন চাহিদা অনুযায়ী তেল উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে নিজের অনুগতদের বসিয়ে চলেছেন।

৫৬ বছর বয়সী রদ্রিগেজ একজন কঠোর ও নিরিবিলি স্বভাবের টেকনোক্র্যাট হিসেবে পরিচিত। তিনি এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তেল মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি অর্থনীতি পরিচালনার জন্য একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং একজন প্রেসিডেন্সিয়াল চিফ অফ স্টাফ নিয়োগ দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি হলো, কিউবার সহায়তায় গড়ে ওঠা ভেনেজুয়েলার দুর্ধর্ষ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিসিআইএম-এর নতুন প্রধান নিয়োগ।

৬৫ বছর বয়সী মেজর জেনারেল গুস্তাভো গঞ্জালেজ এখন এই সংস্থার নেতৃত্ব দেবেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের মতে, এটি রদ্রিগেজের একটি কৌশলী চাল। এর মাধ্যমে তিনি তার নেতৃত্বের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টরপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেয়োকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। উল্লেখ্য, কাবেয়োর সাথে নিরাপত্তা বাহিনী এবং কুখ্যাত মোটরবাইক গ্যাং ‘কোলেক্তিভো’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যারা বিরোধীদের ওপর হামলার জন্য কুখ্যাত।

সরকার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি (রদ্রিগেজ) খুব ভালো করেই জানেন যে আমেরিকানদের সমর্থন ছাড়া তার টিকে থাকা অসম্ভব। তাই তিনি ইতোমধ্যেই সশস্ত্র বাহিনীতে সংস্কার শুরু করেছেন এবং পুরোনো কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুনদের নিয়োগ দিচ্ছেন।

অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ব্যবসায়িক সংযোগের কারণে রদ্রিগেজকে অনেকে ‘জারিনা’ বলে ডাকেন। তেল শিল্পসহ দেশের বেসামরিক প্রশাসনের ওপর তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনও পাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার কারাকাসে সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের সাথে তার বৈঠক সেই সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, কাবেয়ো ক্ষমতাসীন পিএসইউভি সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান এবং সাবেক সেনাসদস্য। মাদুরো বন্দি হওয়ার পর তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা অবস্থায় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে হুঙ্কার দিতে দেখা গেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন তাকে বিরোধী দলের ওপর হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে, তবুও কাবেয়ো রদ্রিগেজের শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাবেয়োর ওপর ২৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কারও ঘোষণা করা আছে।

উত্তেজনা ও আতঙ্ক কারাকাসের পরিস্থিতি এখন বেশ থমথমে। রদ্রিগেজ শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে বিমান-বিধ্বংসী কামানের গোলাবর্ষণ শোনা যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে নতুন মার্কিন হামলার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। পরে জানা যায়, এটি পুলিশ এবং প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির ফল ছিল। দেশের অনেক জায়গায় সমাজতান্ত্রিক দলের স্থানীয় কর্মীরা প্রতিবেশীদের ওপর নজরদারি করছে যাতে কেউ মাদুরোর পতন উদযাপন করতে না পারে।

এই উত্তাল সময়ে রদ্রিগেজকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ‘পুতুল সরকার’ নন। একই সাথে তাকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে এবং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বিশাল সামরিক আমলাতন্ত্রকে বাগে আনতে হচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় জেনারেল ও অ্যাডমিরালের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার, যা সামরিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই কর্মকর্তারা খাদ্য সরবরাহ, কাঁচামাল এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএনিয়ন্ত্রণ করেন।

ডিজিসিআইএম-এর নতুন প্রধান গঞ্জালেজ দীর্ঘকাল কাবেয়োর সাথে কাজ করলেও রদ্রিগেজ তাকে নিজের দলে টেনে নিয়েছেন। তবে গঞ্জালেজ এই সংস্থার ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ সংস্থার ভেতরে এখনো কাবেয়োর অনেক অনুগত রয়ে গেছেন।

একটি সূত্রের মতে, নিপীড়নের আসল হোতা হিসেবে একটি নামই সবার জানা- কাবেয়ো। রদ্রিগেজ বিরোধী পক্ষকে নৈরাজ্যের' দিকে ঠেলে দিয়ে কাবেয়ো দেশটিকে শাসন অযোগ্য করে তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির প্রক্রিয়া ধীর করে দিয়েও তিনি রদ্রিগেজকে চাপের মুখে ফেলতে পারেন।

তবে দেশের বাইরে কাবেয়োর ওপর চাপ বাড়ছেই। মার্কিন প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার এক্সে লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় প্রকৃত উত্তরণ চাইলে দিওসদাদো কাবেয়োকে মার্কিন আদালতের মুখোমুখি হতেই হবে। এটিই হবে দেশটিতে গণতন্ত্র ফেরানোর চূড়ান্ত পদক্ষেপ।