ইসরাইলের দুই বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধের পর গাজা পুনর্গঠনের তদারকি করতে মূলত এই পরিষদ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে দাভোসে বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত ১১ পৃষ্ঠার চার্টারটিতে একবারের জন্যও ‘গাজা’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন উদ্যোগ এখন গাজা ছাড়িয়ে বিশ্বের যে কোনো সংকটে হস্তক্ষেপ করার মতো উচ্চাভিলাষী সংস্থায় রূপ নিয়েছে, যা সাধারণত জাতিসংঘ করে থাকে।
বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে শান্তি পরিষদের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, একবার এই শান্তি পরিষদ পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলে, আমরা যা চাই তাই করতে পারব। এই বোর্ডে ট্রাম্প নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিষদে থাকছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান।
ট্রাম্প এই বোর্ডকে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বোর্ড হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর স্থায়ী সদস্য হতে হলে কোনো দেশকে এক বিলিয়ন ডলার অনুদান দিতে হবে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা এটিকে ‘স্বেচ্ছামূলক’ বলছেন, তবে গাজা পুনর্গঠনে দেশগুলোর কাছ থেকে বড় অংকের আর্থিক অবদান প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত পাকিস্তান, মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার এবং কুয়েত এই বোর্ডে যোগ দেয়ার কথা জানিয়েছে। এছাড়া আর্জেন্টিনা, আজারবাইজান, বাহরাইন এবং মরক্কোর মতো দেশগুলোও এতে শামিল হয়েছে। তবে ভারত, চীন, জাপান এবং বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ এখনও কোনো সাড়া দেয়নি।
এই বোর্ডে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার জানিয়েছেন, পুতিনের মতো নেতার উপস্থিতির কারণে যুক্তরাজ্য এই বোর্ডে যোগ দেবে না।
অন্যদিকে, রুশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পুতিন ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় এক বিলিয়ন ডলার দিতে প্রস্তুত এবং তিনি আমন্ত্রণটি খতিয়ে দেখছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই বোর্ডে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বোর্ড গঠনের মাধ্যমে ট্রাম্প আসলে জাতিসংঘকে অকার্যকর করে নিজেকে বিশ্বমঞ্চের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক ডেভিড ওয়ারিং বলেন, এটি স্পষ্টতই জাতিসংঘকে অপ্রাসঙ্গিক করার একটি প্রচেষ্টা। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বোর্ড জাতিসংঘের সঙ্গে মিলেই কাজ করবে।
বোর্ডের পুরো পরিকল্পনা গাজা পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে হলেও এতে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি রাখা হয়নি। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগ নিয়ে মোটেও আশাবাদী নন। তাদের মতে, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প গাজায় প্রচুর সাহায্য পৌঁছানোর দাবি করলেও বাস্তবে সেখানে এখনো তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট বিরাজ করছে। প্রতিদিনই অনাহারে মারা যাচ্ছে মানুষ।