আবারও কেন তৎপর সোমালি দস্যুরা?

বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো যেনো, পশ্চিমা বিশ্বের কাছে হামাস-হুতি ছাড়া অন্য কোন ঝুঁকি নেই। যে কোন মূল্যে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। যে কোন মূল্যে হামাসের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা হুতিদের লোহিত সাগরে থেকে মুছে ফেলতে হবে, পশ্চিমাদের এই এক চোখা নজরের কারণেই সমুদ্রে অন্যান্য জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

দস্যুরা তো সুযোগ সন্ধনী। সুযোগ পেলে কি আর ছেড়ে দেয়! সোমালিয়ান জলদস্যুরা করলোও ঠিক তাই। ঝোপ বুঝে কোপ মারা যাকে বলে। বেশ কয়েক বছর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, সম্প্রতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে সোমালি জলদস্যুরা। নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ হাত ছাড়া করলা না তুলে নিলো বাংলদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ।

সোমালি জলদস্যুদের উৎপাত নতুন নয়, বলা চলে বেশ পুরোনো। তবে গেলো ক’মাসে তাদের তৎপরতা বেড়েছে কয়েক গুণে। পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধানে কাজ করা ইইউন্যাভ ফর আটলান্টার মতে গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সোমালি উপকূলে কমপক্ষে ১৪টি জাহাজ ছিনতাই করা হয়েছে। বেশিরভাগ জাহাজকে পণের টাকা দিয়েই মুক্ত হতে হয়েছে।

ত্রিকোণাকৃতির ভৌগোলিক মানচিত্রের কারণে পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলকে হর্ন অফ আফ্রিকা বলা হয়। ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এই হর্ন অফ আফ্রিকার দস্যুরা কী পরিমাণ অর্থ আদায় করেছে তার একটি আনুমানিক হিসাব করেছে বিশ্বব্যাংক। সেই হিসাব অনুযায়ী জলদস্যুরা ক্রুদের জিম্মি করে সাড়ে তিনশ’ থেকে সোয়া চারশ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ আদায় করেছে।

২০১১ সালে একটি তেলের ট্যাংকার জব্দ করে দস্যুরা। দুশ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জ্বালানি ছিলো নৌযানটিতে। আটক দুই ফিলিপিনো ক্রুকে হত্যা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওশেন বিয়ন্ড পাইরেসির প্রতিবেদন বলছে, সাগরে দস্যুতার কারণে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে সাত থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার।

তবে জন্ম থেকেই জলদস্যু নয় সোমালিরা। ইন্ডিয়ান ওশান কমিশনের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে সোমালিয়ায় জলদস্যুদের উত্থানের কারণ হিসেবেরা দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ি করা হয়। ১৯৬০ সালে ইতালিয়ান ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে জন্ম হয় সোমালিয়ার । এরপর ১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের উৎখাতের পরে নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে দেশটি।

পরের দুই দশকের বেশি সময় যুদ্ধবিগ্রহে বিধ্বস্ত সোমলিয়াতে কার্যকর কোন সরকার ছিল না। এই সময়টাতে আফ্রিকার মধ্যে দীর্ঘতম উপকূল সমৃদ্ধ দেশটির জলসীমার নিরাপত্তায় কোন কোস্টগার্ড বা বাহিনী ছিল না। এতে এই অঞ্চলে বিদেশি মাছ ধরা নৌযানের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা দস্যুবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

মূলত বিদেশি জাহাজ থেকে সোমালি উপকূলে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার কারণে সোমালি উপকূল স্থানীয় জেলেদের জন্য বসবাসের পরিবেশ হুমকিতে পড়ে। এর প্রতিবাদে স্থানীয় জেলেরা সশস্ত্র দলে বিভক্ত হয়ে বিদেশি জাহাজ ওই অঞ্চলে প্রবেশ বন্ধের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে বিকল্প আয় হিসেবে তারা বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ মুক্তিপণের জন্য ছিনতাই করা শুরু করে।