মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু আর আকাশপথে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সমুদ্রের নীল জলকে তেলের কালচে কালো আর আগুনের লাল রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ইরাকি জলসীমায় ইরানের আত্মঘাতী নৌযানের আঘাতে দুটি বিশাল তেলের ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। যুদ্ধের ১২তম দিনে এসে ইরান বিশ্বকে সোজা জানিয়ে দিয়েছে- অঞ্চলটি অনিরাপদ থাকলে তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইরাকি উপকূলে দুটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারে হামলার পাশাপাশি গালফ অঞ্চলে আরও তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি ট্যাঙ্কারে অন্তত একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। বাহরাইনের মুহারাকে তেলের ট্যাঙ্কে হামলা, ওমানের সালালাহ বন্দরে ড্রোন হামলা এবং সৌদির শায়বাহ তেলক্ষেত্রে ড্রোন অনুপ্রবেশের চেষ্টা, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো এখন ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তু।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, গত ১২ দিনে এই যুদ্ধে ১,১০০-এর বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজ দলের ভরাডুবির আশঙ্কার মুখে কেনটাকিতে এক নির্বাচনী জনসভায় ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকা ইতিমধ্যে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধে জিতেছি, কিন্তু প্রতি দুই বছর পর পর তো আর ফিরে আসতে চাই না। কাজটা আমাদের একবারেই শেষ করতে হবে। আমরা কি তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে চাই? একদমই না!
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন নিঃস্ব এবং তাদের অধিকাংশ নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভিন্ন কথা বলছে। তিনটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরানের নেতৃত্ব এখনো অটুট এবং তাদের সরকার পতনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামান্য আহত হলেও তিনি এখনো কার্যকর কমান্ড বজায় রাখছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বাজার শান্ত করতে তাদের জরুরি মজুদ থেকে ইতিহাসের সবথেকে বড়, ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইরান সরাসরি তেলের সরবরাহ পথে আঘাত হানছে। ইরানের সামরিক মুখপাত্রের হুঁশিয়ারি, ২০০ ডলারের জন্য প্রস্তুত হোন। কারণ তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, যা আপনারা (আমেরিকা) ধ্বংস করেছেন।

এশিয়ান বাজারে বৃহস্পতিবার তেলের দাম ১০ শতাং বেড়ে আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে এশিয়ার সব শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন হরমুজ প্রণালী ‘চমৎকার’ অবস্থায় আছে এবং আমেরিকা এটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি বলছে, ইরান সেখানে অন্তত এক ডজন মাইন পেতে রেখেছে। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো এখন তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সামরিক পাহাড়ায় পার করে দেয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে।
ট্রাম্প যখন ‘কাজ শেষ করার’ কথা বলছেন, তখন ইরান তাদের পাল্টা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট হোটেল, ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোকে বেছে নেয়ার হুমকি দিয়েছে। এফবিআই এমনকি আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে ইরানি ড্রোন হামলার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে।
একদিকে তেলের পাম্পে আকাশচুম্বী দাম আর অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার মানুষের রক্ত—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ এখন এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।
‘ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলারে তেল কিনতে প্রস্তুত থাকুন’