মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন কেবল মিসাইল আর বোমার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন এক ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বুধবার পারস্য উপসাগরে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার পর তেহরান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বিশ্বকে এখন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলার দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশ্ব জ্বালানি সংস্থা মজুত ছেড়ে দিলেও এই মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে না।
বুধবার পারস্য উপসাগরে ইরানের নির্দেশ অমান্য করায় তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী- আইআরজিসি। এর মধ্যে একটি থাই পতাকাবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং তিনজন ক্রু ইঞ্জিনের ভেতরে আটকা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন।

অন্য দুটি জাহাজেও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আঘাত লেগেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ নিয়ে মোট ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হলো।
ইরানি সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাকারি সরাসরি ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ২০০ ডলার তেলের দামের জন্য তৈরি হোন। কারণ তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, যা আপনারা ধ্বংস করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের দাবি সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই।
কেনটাকিতে এক জনসভায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকা এই যুদ্ধে জিতে গেছে। তিনি জানান, মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের ৫৮টি নৌ-জাহাজ ধ্বংস করেছে এবং তাদের বিমানবাহিনী বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ট্রাম্প বলেন, আমরা কাজটা শেষ করতে চাই। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে চাই না। ওদের কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো বিমানবাহিনী নেই, আমরা এখন ওই দেশের ওপর দিয়ে মুক্তভাবে উড়ে বেড়াচ্ছি।
তবে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী ‘নিরাপদ’ দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্বয়ং পেন্টাগন জানিয়েছে যে, ইরান সেখানে মাইন পেতে রেখেছে এবং কোনো জাহাজই এখন নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে না।
বিশ্ব বাজারে তেলের ভয়াবহ সংকট রুখতে ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নির্দেশে আগামী সপ্তাহ থেকেই ১৭ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল বাজার স্থিতিশীল করতে ছাড়া হবে। ১৯৭০-এর দশকের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে এটিই সবথেকে বড় ‘অয়েল শক’ বা তেলের ধাক্কা।
ইরানের অভ্যন্তরে চলছে যুদ্ধের প্রথম দিনে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ কমান্ডারদের জানাজা। সেখানে রয়টার্সের এক তথ্যে জানা গেছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ওই হামলায় সামান্য আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ওই একই হামলায় তাঁর বাবা, মা, স্ত্রী এবং এক পুত্র নিহত হন।
এদিকে, ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানালেও দেশটির পুলিশ প্রধান আহমদরেজা রাদান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা রাস্তায় নামবে তাদের বিক্ষোভকারী নয়, ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যেকের আঙুল এখন বন্দুকের ট্রিগারে।
আমেরিকার আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের কাছে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করা এখন অস্তিত্বের লড়াই। অন্যদিকে, ইরান তাদের শেষ সম্বল অর্থাৎ তেলের সরবরাহ বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা দিতে চায়। এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলায় তেলের দাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যুদ্ধ থামানোর তিনটি শর্ত দিলো তেহরান