সিংহ-সিংহীর নাম আকবর, সীতা রেখে বরখাস্ত বন সংরক্ষক

শেক্সপিয়রের ‘রোমিও-জুলিয়েট’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্রিপুরার মুখ্য প্রধান বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও ইকোপর্যটন) প্রবীণ লাল আগরওয়াল হয়তো ভেবেছিলেন যে, ‘নামে কী আসে যায়। কিন্তু ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’দের সম্পর্কে কম জানা থাকায় তার সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

কারণ, সিংহের নাম মোঘল সম্রাট আকবর এবং সিংহীর নাম হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবী সীতা নামে রাখার যে দুঃসাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তার খেসারত এখন চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।

ভারতজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ত্রিপুরার বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার প্রবীণ লালকে বরখাস্ত করেছে বলে সোমবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

সঙ্গিনী সীতাসহ আকবরকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নেওয়া হয় শিলিগুড়ির সাফারি পার্কে। এর আগে তাদের রাখা হয়েছিলো ত্রিপুরার বিশালগড়ের সিপাহিজলা চিড়িয়াখানায়।

আকবর-সীতার সঙ্গে শিলিগুড়িতে নেওয়া হয় এক জোড়া কালো হরিণ ও এক জোড়া লেপার্ডকে। এর বিনিময়ে সিহাপিজলা চিড়িয়াখানাকে দেওয়া হয় এক জোড়া লেপার্ড ও এক জোড়া বাঘকে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশালগড়ের চিড়িয়াখানাতেই সিংহকে আকবরকে এবং সিংহীকে সীতা নাম দেন প্রবীণ লাল আগরওয়াল। তখন তিনি ছিলেন প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন।

সিপাহিজলা চিড়িয়াখানা থেকে শিলিগুড়িতে পাঠানোর নিবন্ধন বইতেও সিংহকে আকবর আর সিংহীকে সীতা নামে লিপিবদ্ধ করা হয়।

আর শিলিগুড়ি সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষও এই দুই বন্যপ্রাণীকে হাতে পেয়ে আকবর ও সীতা নামেই নিবন্ধন বইতে অন্তর্ভুক্ত করে। এরপরই নামের বিষয়টি সামনে চলে আসে এবং ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিতর্ক।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) উচ্চ আদালতের দারস্থ হয়। কেনো সিংহের নাম আকবর, আর সিংহীর নাম সীতা রাখা হবে, আর কেনো তাদের একসঙ্গে রাখা হবে তা নিয়ে আপত্তি তোলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।

আদালতে তারা দাবি তোলেন যে, সিংহ-সিংহীর নামকরণ ও তাদের একসঙ্গে রেখে ধর্মের অবমাননা করেছে রাজ্যের বন দপ্তর। বিতর্ক এড়াতে সিংহ-সিংহী জুটির নাম বদল করতে বৃহস্পতিবার আদেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট।

কিন্তু আদালতের আদেশের পরও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন বিভাগ সিংহ, সিংহীর নাম বদলাতে গড়িমসি শুরু করে। তারা যুক্তি দেখায় যে, এই নাম দিয়েছে ত্রিপুরার বিশালগড়ের সিপাহিজলা চিড়িয়াখানা। তাই নামের পরিবর্তন বা পরিমার্জনের দায়িত্ব বা এখতিয়ারও চিড়িয়াখানাটির।

হাইকোর্টের রিটে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দাবি করে যে, দেবী সীতা ও মোঘল সম্রাট আকবরের নামে পশুর নামকরণ করা অযৌক্তিক এবং চরমভাবে ধর্ম অবমাননার শামিল।  

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, ‘কারা এই নাম রেখেছেন? এতো বিতর্ক কারা তৈরি করছেন? কোনো পশুর নাম কি কোনো দেবতা, পৌরাণিক নায়ক, স্বাধীনতা সংগ্রামী অথবা নোবেলজয়ী ব্যক্তির নামে রাখা যায়?

বিচারপতি বলেন, সিংহ-সিংহীর নাম আকবর আর সীতার নামে রেখে শুধু শুধু বিতর্ক ডেকে আনা হয়েছে। এই বিতর্ক এড়ানো যেতো। শুধু সীতা নয়, আকবর নামটিও রাখা উচিত নয়। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের মহৎ সম্রাট ছিলেন। অত্যন্ত দক্ষ এবং ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। রাজ্যের উচিত ছিল এই ধরনের নামের বিরোধিতা করা।’

আদালতে পশ্চিমবঙ্গের অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ত্রিপুরাতেই ওই সিংহ ও সিংহীর নামকরণ করা হয়েছিলো। রাজ্য নাম পরিবর্তন করার কথা বিবেচনা করছে।