রিলস দেখে কোটি টাকার লোভে ভুপালে বন্ধুকে খুন!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো অন্ধ বিশ্বাস বা ভুয়া ভিডিও কোনো মানুষের জীবন কতটা ভয়াবহভাবে কেড়ে নিতে পারে, ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভূপালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এক ঘটনায় তার চরম ও নৃশংস এক চিত্র ভেসে উঠেছে। ইনস্টাগ্রামের একটি রিল দেখে ১ কোটি ২০ লাখ রুপি পাওয়ার লোভে ১৭ বছরের এক অনাথ ও অসহায় কিশোরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে পাঁচজনের একটি গ্যাং!

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সত্য। জোহেব খান (২০) নামের এক বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মেডিকেল ডাক্তারের অ্যাপ্রন পরে মিথ্যা পরিচয় তৈরি করেছিল। জোহেব ইনস্টাগ্রামে একটি রিল দেখে তার সহযোগীদের বোঝাতে সক্ষম হয়, ১৫-১৬ বছরের কোনো কিশোরের অণ্ডকোষ নাকি প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বিক্রি করা সম্ভব! তার পরনে ডাক্তারের অ্যাপ্রন থাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা এই আজব দাবির পেছনে কোনো সত্যতা অনুসন্ধান না করেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে নেয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা বা চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিংবা অঙ্গ পাচার চক্রের বাজারে এই আজব দাবির বিন্দুমাত্র কোনো ভিত্তি বা অস্তিত্ব নেই। শুধু একটি অবাস্তব রিল দেখে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার অবাস্তব স্বপ্নে তারা মেতে ওঠে।

যেভাবে ফাঁদে ফেলা হলো রেহানকে: হত্যার শিকার রেহান (১৭) একজন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা পাবলিক টয়লেটে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন, আর রেহান ভূপালের ইকবাল ময়দান ও মতি মসজিদের সামনে কলম ও কি-চেইন বিক্রি করে সংসার চালাত। আসামিরা আগে থেকেই রেহানকে চিনত এবং এই নৃশংস চক্রান্তের শিকার বানানোর জন্য তাকেই বেছে নেয়।

গত ৬ আগস্ট দুই অভিযুক্ত ইকবাল ময়দানে গিয়ে রেহানকে জানায়, তাদের অন্য এক ছেলের সাথে ঝামেলা হয়েছে এবং মারামারিতে সাহায্যের জন্য তার ডাক পড়েছে। মাত্র ১০০ রুপি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা রেহানকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা ওত পেতে ছিল।

নির্দয়ভাবে পিছন থেকে আক্রমণ করে রেহানকে ছুরি ও ব্লেড দিয়ে একের পর এক কোপানো হয়। রেহানের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর, দূর থেকে ফোনে দেওয়া জোহেবের নির্দেশ অনুযায়ী তার শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গ কেটে পলিথিন ব্যাগে আলাদা করে ফেলা হয়।

কিন্তু আসল নাটক শুরু হয় এর পরেই! হত্যার পর অঙ্গ কেটে নিলেও, সেই তথাকথিত ‘১.২০ কোটি রুপির ক্রেতা’ কে? সেই উত্তর কারও জানা ছিল না। আসামিরা পলিথিনে সেই অঙ্গ নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে  ক্রেতার সন্ধান করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত যখন কোনো কাল্পনিক ক্রেতার খোঁজ মিলল না এবং কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তখন তারা বাধ্য হয়ে তা নদীতে ফেলে দেয়!

যেভাবে প্রকাশ পেল সত্য: ১০ আগস্ট ছোট তালাবের ধোবিঘাট এলাকা থেকে এক অজ্ঞাতনামা পচাগলে যাওয়া লাশ উদ্ধার করে ভূপাল পুলিশ। পরিচয় না পাওয়ায় স্বাভাবিক নিয়মেই লাশটি দাফন করা হয়। পরবর্তীতে ১৫ আগস্ট এক নারী তাঁর নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে এলে হাতের একটি বিশেষ ট্যাটু দেখে তিনি লাশটিকে নিজের ছেলে রেহান বলে শনাক্ত করেন।

রেহানের পরিচিত ও শেষবার যাদের সাথে দেখা গিয়েছিল, তাদের ওপর নজরদারি চালিয়ে পুলিশ জোহেব খান ও আমির কুরাইশিকে গ্রেপ্তার করে এবং বাকি তিন নাবালককে আটক করে। এই কুখ্যাত ঘটনার পেছনে ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার এক টুকরো ভুয়া তথ্য আর রাতারাতি ধনী হওয়ার অন্ধ লোভে এক নিরীহ কিশোরের প্রাণ গেল, যা আজ ভূপালবাসীকে শিউরে তুলছে!

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি