ভারতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে টানা দীর্ঘ ৩৭ দিনের আন্দোলন ও জেন-জি বিক্ষোভের সাফল্যের পর, তরুণদের তুমুল জনপ্রিয় প্লাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) তাদের নতুন লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশের জরাজীর্ণ সরকারি স্কুলগুলোকে।
তবে ‘ফিক্স দ্য স্কুল’ বা স্কুল সংস্কার নামের এই নতুন অভিযান শুরু হতেই রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
গত ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কারিসুন্ডা গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সাবেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে যান ২৬ বছর বয়সী সিজেপি কর্মী আব্দুল হাফিজ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেহাল দশা, খাবার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে সিজেপির কেন্দ্রীয় আহ্বানের অংশ হিসেবেই তাঁর এই সফর ছিল।

অভিযোগ উঠেছে, এই পরিদর্শনের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) স্থানীয় কর্মীরা হাফিজের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় হাফিজ এবং তাঁর ৫১ বছর বয়সী বাবা মোহাম্মদ মাফিক গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় দু’দিন পর ১৫ আগস্ট হাফিজের বাবা মারা যান।
তবে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ ঘটনার দায় অস্বীকার করে বলেছেন, হামলাকারীরা ক্রিমিনাল, তাদের সাথে বিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, বাবার দাফন সম্পন্ন করার পর হাফিজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, রক্তের বিনিময়ে হলেও তারা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও বাবার হত্যার বিচারে অনড় থাকবেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে গোটা দেশজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের নিকটস্থ সরকারি স্কুলগুলো অডিট করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অডিট চেকলিস্টে মূলত চারটি মৌলিক দাবি রয়েছে।
এগুলো হলো- এক. বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং কার্যকর শৌচাগারের ব্যবস্থা। দুই. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ব্যবহারের উপযোগী শ্রেণিকক্ষ। তিন. সীমানা প্রাচীর ও সামগ্রিক ক্যাম্পাস নিরাপত্তা এবং চার. মানসম্মত মধ্যাহ্নভোজ (মিড-ডে মিল) ও শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি।

আন্দোলন দমাতে ইতিমধ্যে সরকারি প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজস্থানের বিজেপি সরকার সম্প্রতি বহিরাগতদের স্কুলে প্রবেশ, ছবি তোলা ও ভিডিও করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং অডিটের নামে স্কুলে প্রবেশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে সিজেপির ছাত্র সমাবেশের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আশুতোষ রাঙ্কা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অসীম আলীর মতে, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো না থাকা সত্ত্বেও সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমা ধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে তৃণমূল স্তরে সক্রিয় করে তুলছে। এতে আন্দোলন পরিচালনার খরচ অভূতপূর্বভাবে কমে গেলেও, রাজনৈতিক সুরক্ষা না থাকায় সাধারণ সমর্থকরা সহিংসতার ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
শিক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ সামিনা বানুর মতে, ভারতের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা চরম অব্যবস্থাপনা, ভুয়া নিয়োগ এবং অকার্যকর শিক্ষক কাঠামোর কারণে ভেঙে পড়েছে। সিজেপি এই ইস্যুটিকে মূলধারার রাজনীতিতে এনে প্রশংসনীয় কাজ করেছে, তবে স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রশাসনিক পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি।
সব বাধা অতিক্রম করে ককরোচ জনতা পার্টি তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সরকার যত বাধা দেবে, এই ছাত্র-তরুণদের প্রতিরোধ ততটাই শক্তিশালী রূপ নেবে।
