আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নতুন এক নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার ও নির্দিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ ভোটার বা অন্য কেউ মোবাইল ফোন বহন করতে পারবেন না।
রোববার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইসি এই সিদ্ধান্ত জানায়, যা প্রকাশের পর থেকেই জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইসির নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ ইসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণের দিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
তবে তিন ধরনের ব্যক্তি মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এরা হলেন- ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার, কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ইনচার্জ এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী আনসার বা ভিডিপির দুই সদস্য।
ইসি জানিয়েছে, ভুলবশত কেউ ফোন নিয়ে এলে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা রেখে ভোট দিতে পারবেন। তবে হাজার হাজার ভোটারের ফোন জমা রাখা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোটারদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তার শঙ্কা
দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভোটারদের জন্য এই সিদ্ধান্ত বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক এবং অসুস্থ ভোটারদের জন্য যাতায়াত ও জরুরি প্রয়োজনে পরিবারের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম মোবাইল ফোন। অনেক ভোটার জানিয়েছেন, ফোন রাখার নিরাপদ জায়গা না থাকলে তারা ভোট দিতেই যাবেন না। শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটারদের মতে, ডিজিটাল যুগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিসিএস বা পাবলিক পরীক্ষার মতো কঠোরতা যা সাধারণ নির্বাচনের আমেজকে নষ্ট করছে।
স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রবাহে বাধার অভিযোগ
সামাজিক মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহসহ বিশিষ্টজনদের মতে, সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাৎক্ষণিক অনিয়ম বা ভোট জালিয়াতির চিত্র মোবাইল ক্যামেরার মতো দ্রুত জনসমক্ষে আনা সম্ভব নয়।
ব্যক্তিগত ফোন না থাকলে কেন্দ্র দখল বা জালিয়াতির ভিডিও করা যাবে না, যা মূলত স্বচ্ছতাকে আড়াল করার একটি কৌশল হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
সংবাদকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাংবাদিকদের নিয়ে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ জানিয়েছেন, চিঠির ভাষা অনুযায়ী সাংবাদিকরাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। সাংবাদিকরা যদি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারেন, তবে তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচার এবং নির্বাচনী অনিয়ম তুলে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কমিশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে দ্রুত ব্যাখ্যা দেবেন।
নির্বাচন ও অংশগ্রহণকারী দল আগামী বৃহস্পতিবার ৬৪ জেলার ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে একযোগে ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে। শেরপুর- ৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে। এবার ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।
ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে ইসির এই সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে এবং নির্বাচনের সামগ্রিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।