বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর একেবারে চূড়ান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া এবং ভৌত পরীক্ষার (ফিজিকস টেস্ট) ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ায় পরবর্তী ধাপ বা ‘পাওয়ার স্টার্ট’ (সি-স্টেজ) শুরুর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বায়েরার পক্ষ থেকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ সুগম হলো।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, এর আগে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় কিছু ত্রুটি ধরা পড়ায় সেপ্টেম্বর মাসের নির্ধারিত পরিকল্পনা কিছুটা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে সফলভাবে তা সম্পন্ন করার পর বায়েরার অনুমতি সাপেক্ষে গত ১১ অক্টোবর চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া (নিউক্লিয়ার রিয়্যাকশন) শুরু হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন অনুমোদিত ‘সি-স্টেজ’ বা পাওয়ার স্টার্ট ধাপে বিভিন্ন পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপদ ও স্থিতিশীল কার্যক্রম শতভাগ নিশ্চিত করা। এ পর্যায়ে চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে এসব ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, শূন্য শক্তি উৎপাদন দিয়ে এই ধাপ শুরু হবে। চুল্লিতে শক্তি উৎপাদন যখন শূন্য থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে, তখনই জেনারেটর জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরেই গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। এরপর দীর্ঘ ৭ থেকে ৮ মাস ধরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন অব্যাহত থাকবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে এবং রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অসমস্ট্রয়এক্সপোর্ট’-এর মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নিয়ে এই মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল রূপপুর।
প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারিত থাকলেও, দুই দফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কাজের মেয়াদ বাড়লেও সামগ্রিক প্রকল্পের মূল খরচ বাড়ানোর কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
তবে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়ে বর্তমানে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সি-স্টেজ অনুমোদনের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প এখন দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় এক ঐতিহাসিক সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।