ভারতীয় বোলারদের বিপক্ষে রান উৎসবে মেতে ওঠা ব্যাটারদের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য তালিকায় ড্যারিল মিচেল এক সাম্প্রতিকতম সংযোজন। জাভেদ মিয়াঁদাদ, জহির আব্বাস, ম্যাথু হেইডেন কিংবা গ্রাহাম গুচের মতো রথী-মহারথীরাও এই তালিকায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন।
বিশেষ করে গত সোয়া দুই বছরে কিউই ব্যাটার মিচেল ভারতের বিপক্ষে দুহাত ভরে রান তুলেছেন; ২০২৩ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের নয়টি শতকের মধ্যে চারটিই এসেছে প্রিয় প্রতিপক্ষ ভারতের বিপক্ষে। ধর্মশালায় লিগ পর্বের ম্যাচে ১৩০ রানের ইনিংসটির পর থেকে তাঁর রানগুলো হলো যথাক্রমে ১৩৪, ১৭, ৬৩, ৮৪, ১৩১ (অপরাজিত) এবং ১৩৭।
সাহিবজাদা ফারহানকে এখনো হয়তো মিচেলদের মতো কিংবদন্তিদের কাতারে আলোচনা করা হয় না, তবে তার কারণ শুধু অভিজ্ঞতার অভাব। ২৯ বছর বয়সী এই পাকিস্তানি ওপেনার ভারতের বিপক্ষে খেলেছেন মাত্র তিনবার- সবগুলোই গত সেপ্টেম্বরে দুবাইয়ে হওয়া টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপে।
কিন্তু এই অল্প সুযোগেই তিনি ৪০, ৫৮ এবং ৫৭ রানের নজরকাড়া ইনিংস খেলেছেন। তাঁর ১৫৫ রানের ৬৩.২ শতাংশই এসেছে বাউন্ডারি থেকে (১১টি চার ও ৯টি ছক্কা)। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, ফারহান যা করেছেন তা খুব কম ব্যাটারই পেরেছেন, তিনি জাসপ্রিত বুমরাহকে রীতিমতো চাপে ফেলে দিয়েছিলেন।
ওই এশিয়া কাপে বুমরাহ প্রথম দুই ম্যাচে পাওয়ার-প্লেতে তিনটি করে ওভার এবং ফাইনাল ম্যাচে দুটি ওভার বোলিং করেছিলেন। সেই আট ওভারে এই ডানহাতি ব্যাটার বুমরাহকে ৬টি চার ও ৩টি ছক্কায় ভাসিয়ে দেন। ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে বুমরাহকে এক ম্যাচে তিনটি ছক্কা মারা প্রথম ব্যাটার হলেন ফারহান। যে বোলারের ৮৮টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ইকোনমি রেট মাত্র ৬.৫২ এবং ২৬৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৬.৯২, তাঁর বিরুদ্ধেই ফারহান ১৫০-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে রান তুলেছেন।
বুমরাহর বিপক্ষে ফারহানের পরিকল্পনা ছিল সহজ ও নিখুঁত। তিনি কোনো বাড়তি কারিকুরি না করে সোজাসুজি ব্যাট চালানোর ওপর জোর দিয়েছেন। আড়াআড়ি শট খেলার ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি নিজের মূল শক্তি অর্থাৎ স্ট্রেট ড্রাইভের ওপর ভরসা রেখেছেন। কিছুটা জায়গা বানিয়ে এবং সামনের পা সরিয়ে তিনি মাঠের ওপর দিয়ে বা গ্রাউন্ডেড ড্রাইভ খেলেছেন। দেখে মনে হতে পারে তিনি হয়তো উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসবেন, কিন্তু তিন ইনিংসে ১২৪ স্ট্রাইক রেটে ৫১.৬৬ গড় নির্দেশ করে যে তাঁর এই মারমুখী মেজাজের পেছনে ছিল এক গভীর গাণিতিক হিসেব এবং নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
হেড কোচ মাইক হেসন তাঁর ব্যাটিংয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন, দুই বছর আগে ক্রাইস্টচার্চে ৫ বা ৭ নম্বরে খেলানোর অনিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে তিনি ঘোষণা দেন ফারহান এখন থেকে ওপেনিংয়েই থিতু হবেন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর নয়টি হাফ সেঞ্চুরির প্রতিটিই এসেছে টপ অর্ডারে। আর যে ব্যাটার বুমরাহকে শাসন করার ক্ষমতা রাখেন, তাঁকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই।
শনিবার নামিবিয়ার বিপক্ষে ভারত বুমরাহকে পাওয়ার-প্লের পর ব্যবহার করেছিল, তবে রোববার প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে সেই কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। বুমরাহ বনাম ফারহান- এই দ্বৈরথ এখন ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণ। একদিকে আত্মবিশ্বাসী পাকিস্তানি ব্যাটার, অন্যদিকে একজন জেদি ভারতীয় পেসার যিনি ২৪ বলের স্পেলে একটি বাউন্ডারি হজম করাও ঘৃণা করেন।
তবে ফারহানকে ভারত চিনলেও পাকিস্তানের হাতে উসমান তারিক নামে এক ‘অচেনা রহস্য’ আছে। তাঁর উঠে আসার গল্পটি রূপকথার মতো। দুবাইয়ের এক অটোমোবাইল কারখানায় লজিস্টিকস ও প্রকিউরমেন্টের কাজ করতেন তিনি। মহেন্দ্র সিং ধোনির বায়োপিক ‘এমএস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ দেখে নিজের স্বপ্ন পূরণের প্রেরণা পান তারিক। করাচিতে ফিরে এসে পাকিস্তানের হয়ে খেলার লড়াই শুরু করেন।
দীর্ঘ এক দশকের পরিশ্রম শেষে আজ তিনি স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায়, ঘোরতর প্রতিপক্ষ ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ম্যাচে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তিনি।