গত বছর দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অধরা আইপিএল ট্রফি ছুঁয়েছিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। আর এবার তারা প্রমাণ করল যে সেই সাফল্য কোনো ফ্লুক ছিল না। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে রোববার রাতে হাইভোল্টেজ ফাইনালে গুজরাট টাইটান্সকে ৫ উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো আইপিএল শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলল বেঙ্গালুরু।
বিশ্বমঞ্চে ধ্রুপদী ব্যাটিংয়ের এক অনবদ্য প্রদর্শনীতে ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে আরসিবিকে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরালেন কিংবদন্তি বিরাট কোহলি।
আহমেদাবাদের ৯০ হাজারেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতিতে টস জিতে প্রথমে গুজরাটকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানায় বেঙ্গালুরু। আরসিবির বোলারদের নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল বোলিংয়ের সামনে শুরু থেকেই ধুঁকতে থাকে গুজরাটের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ।
জোশ হ্যাজলউড, ভুবনেশ্বর কুমার এবং স্পেশালিস্ট পেসার রসিখ সালামের তোপের মুখে পড়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেটে মাত্র ১৫৫ রানেই থমকে যায় গুজরাটের ইনিংস। রসিখ সালাম মাত্র ২৭ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন।
এছাড়া হ্যাজলউড ও ভুবনেশ্বর কুমার প্রত্যেকে ২টি করে উইকেট নেন। গুজরাটের পক্ষে একমাত্র ওয়াশিংটন সুন্দরই যা একটু লড়াই করতে পেরেছিলেন, তিনি ৫০ রানে অপরাজিত থাকেন। ওপেনার শুভমান গিল (১০) ও সাই সুদর্শন (১২) দ্রুত বিদায় নিলে বড় সংগ্রহের স্বপ্ন ভেস্তে যায় গুজরাটের।
১৫৬ রানের মাঝারি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বেঙ্গালুরুকে ঝড়ো সূচনা এনে দেন বিরাট কোহলি ও ভেঙ্কটেশ আয়ার। আয়ার মাত্র ১৬ বলে ৩২ রান করে মোহাম্মদ সিরাজের শিকার হলে ভাঙার আগে উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৬২ রান।
এরপর কাগিসো রাবাদা ও রশিদ খানের জোড়া আঘাতে দেবদত্ত পাডিক্কাল, অধিনায়ক রজত পাটিদার (১৫) এবং ক্রুনাল পান্ডিয়া দ্রুত সাজঘরে ফিরলে ম্যাচ কিছুটা জমে ওঠে। তবে টিম ডেভিডকে (২৪) সাথে নিয়ে দলের হাল ধরেন কোহলি।
ডেভিড বিদায় নিলেও জিতেশ শর্মাকে সাথে নিয়ে ১২ বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করেন কোহলি। ম্যাচের শেষ শটে এক নান্দনিক ছক্কা হাঁকিয়ে যখন জয় নিশ্চিত করেন, তখন ৩৭ বছর বয়সী এই মহাতারকা গ্যালারির দিকে আঙুল উঁচিয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করেন।
নিজের ৩৩তম জন্মদিনে টানা দ্বিতীয় ট্রফি জিতে এমএস ধোনি (২০১০ ও ২০১১) এবং রোহিত শর্মার (২০১৯ ও ২০২০) মতো অভিজাত অধিনায়ক মহলে নিজের নাম লেখালেন আরসিবি অধিনায়ক রজত পাটিদার। ম্যাচ শেষে ট্রফি হাতে স্বভাবসুলভ শান্ত পাটিদার বলেন, এই বছরের টুর্নামেন্টজুড়ে আমরা অনেক বেশি শান্ত ও পরিপক্ব ক্রিকেট খেলেছি। আমার অধিনায়কত্ব একটু ভিন্ন, আমি মাঠে খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করি না, তবে খেলার পরিস্থিতির ওপর আমার কড়া নজর থাকে।
অন্যদিকে ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানো বিরাট কোহলি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই মুহূর্তটির স্বপ্ন আমি বহুবার দেখেছি। আমরা জানতাম আমাদের ড্রেসিংরুমে কী পরিমাণ প্রতিভা আছে। আমরা শুধু একটা কথাই নিজেদের বলেছিলাম, যদি আমরা পরিকল্পনাগুলো মাঠে ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে এই টুর্নামেন্টের সেরা দল আমরাই।
লড়াই অরেঞ্জ ক্যাপের ও এক বিস্ময় বালকের উত্থান
শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচের পাশাপাশি দর্শকদের নজর ছিল এই মৌসুমের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের পুরস্কার অরেঞ্জ ক্যাপের দিকে। গুজরাটের শুভমান গিল (৭৩২ রান) ও সাই সুদর্শন (৭২২ রান) যথাক্রমে তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে শেষ করেন এবং বিরাট কোহলি ৬৭৫ রান নিয়ে চতুর্থ হন।
তবে সবাইকে চমকে দিয়ে রাজস্থান রয়্যালসের মাত্র ১৫ বছর বয়সী বিস্ময় বালক বৈভব সূর্যবংশী ৭৭৬ রান করে অরেঞ্জ ক্যাপ জিতে নেন। এই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় এবং ‘ইমার্জিং প্লেয়ার’- দুটি পুরস্কারই গেছে এই কিশোর তুর্কির ঝুলিতে।
গুজরাট টাইটান্সের ব্যাটিং কোচ ম্যাথু হেইডেন আরসিবির বোলারদের প্রশংসা করে বলেন, আমাদের দলে বিশ্বমানের হিটার থাকা সত্ত্বেও আমরা পাওয়ারপ্লে-তে রান তুলতে পারিনি। আরসিবি এক অবিশ্বাস্য বোলিং পারফর্ম দেখিয়েছে। তিন বছরের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার ফাইনাল খেলে রানার্স-আপ হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো গুজরাটকে। আর আহমেদাবাদের রাতটি শেষ পর্যন্ত রাঙিয়ে রাখল কোহলি-পাটিদারের অপরাজেয় বেঙ্গালুরু।