২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বজয়ের মিশন শুরু করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী থাকল ৩৮ বছর বয়সী লিওনেল মেসির এক অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের, যেখানে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিকটি তুলে নেন। পাশাপশি মাঠে নেমেই গড়েছেন সর্বাধিক বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড।
এই অবিশ্বাস্য কীর্তির পর যখন পুরো স্টেডিয়াম মায়ামির জাদুকরের জয়গানে মুখরিত, তখনই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠের মাঝখানে কান্নায় ভেঙে পড়লেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে, ম্যাচ শেষে মেসি নিজেই খোলসা করেছেন, এই চোখের জলের সাথে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ছিল এক ছেলের তাঁর বাবার জন্য গভীর আবেগ ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।
আর্জেন্টিনার বিখ্যাত রেডিও মিত্রের সাংবাদিক এদুয়ার্দো ফেইনম্যান পরে আসল রহস্য ফাঁস করে জানান, মেসির এই কান্নার পেছনে রয়েছেন তাঁর ৬৮ বছর বয়সী বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি। গত বছরের শেষ দিক থেকে গত কয়েক মাস ধরে তিনি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
বাবার এই অসুস্থতার কারণে গত কয়েকটা দিন চরম মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে কেটেছে মেসির, যার বাঁধভাঙা প্রকাশ ঘটেছে মাঠের এই হ্যাটট্রিকের রাতে।
হোর্হে মেসি শুধু লিওনেলের বাবাই নন, তিনি ফুটবল ইতিহাসের এই সেরা তারকার আজীবনের এজেন্ট, বিজনেস ম্যানেজার এবং মেসির অফ-ফিল্ড বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি। তবে, পর্দার আড়ালে হোর্হে মেসির এই একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে এবার বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেছেন পোলিশ মিডফিল্ডার মাতেউস ক্লিচ।
মার্কিন ক্লাব ইন্টার মায়ামির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে বোমা ফাটিয়ে ক্লিচ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মেসি যতদিন আছে, আমি কাউকে মায়ামিতে যাওয়ার পরামর্শ দেব না। ক্লাবটি এখন একটা আস্ত বিপর্যয়। একের পর এক কর্মকর্তা, কোচ এবং ফিজিওথেরাপিস্টরা ক্লাব ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সাংগঠনিকভাবে ক্লাবটির অবস্থা খুবই খারাপ। কারণ, মেসির বাবা মূলত পুরো ক্লাবটি চালাচ্ছেন! সেখানে সবাই স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে এবং মেসির পরিবারের অনুমতি ছাড়া একটা পাতাও নড়ে না।
মেসির শৈশব এবং বার্সেলোনায় যাওয়ার পেছনে হোর্হে মেসির অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১২ সালের এক সাক্ষাৎকারে হোর্হে জানিয়েছিলেন, মেসির হরমোন চিকিৎসার জন্য আর্জেন্টিনার ক্লাব নুয়েলস ওল্ড বয়েজ প্রতি মাসে মাত্র ৪০০ আর্জেন্টাইন পেসো দিত, যা চিকিৎসার খরচের তুলনায় কিছুই ছিল না। এই ক্ষোভ থেকেই তাঁরা বার্সেলোনায় পাড়ি জমান।
স্পেনে যাওয়ার পর কাগজের নথিপত্র বা ডকুমেন্টেশনের জটিলতার কারণে মেসি কিছুদিন খেলতে পারেননি, যা কিশোর মেসিকে চরম হতাশ করেছিল। পরিবারের বাকিরা আর্জেন্টিনায় ফিরে যেতে চাইলেও, মেসির জেদের কারণেই তাঁরা স্পেনে থেকে যান। হোর্হে মেসি ‘মেসি পরিবার না খেয়ে থাকত’ এমন গুঞ্জনকে শুধু একটি রূপকথা বা মিথ বলে উড়িয়ে দিয়ে জানান, তাঁরা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিলেন এবং তিনি নিজে মেসির পায়ে হরমোনের ইনজেকশন পুশ করতেন।
বাবার চোখে ফুটবল বিশ্বের এই মহাতারকা আসলে অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। হোর্হে বলেন, লিওনেল ক্যামেরার সামনে বা ইন্টারভিউতে লাইমলাইটে থাকতে একদম পছন্দ করে না, ও অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ও ভীষণ পারিবারিক একটা ছেলে। টিভির সামনে বসে ফুটবল দেখা আর মায়ের হাতের গরুর মাংসের স্টেক খাওয়া, এটাই ওর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। লিওকে সবসময় একটু প্যাম্পার বা আদর দিয়ে আগলে রাখতে হয়, ও ছোটবেলা থেকেই এমন।
খেলার মাঠের বাইরে ২০১৯ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে জেলহাজতে গিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন হোর্হে মেসি। তবে সেই সব বিতর্ক ছাপিয়ে, শৈশবে বার্সেলোনায় থাকার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে আজকের ইন্টার মায়ামির রাজত্ব, লিওনেল মেসির জীবনের প্রতিটা বাঁকে নেপথ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী কারিগর হিসেবে রয়ে গেছেন এই হোর্হে হোরাসিও মেসিই। এখন ফুটবল ভক্তদের প্রার্থনা, বাবার দ্রুত সুস্থতা যেন মেসির পায়ে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতেও এই জাদুকরী ছন্দ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
তথ্যসূত্র: ও গ্লোবো