৩৯ বছর বয়সেও মেসি একটা গোলমেশিন: স্কালোনি

ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মিশনের একমাত্র কাণ্ডারি কে? এই প্রশ্নে পুরো ফুটবল বিশ্ব এক বাক্যে যার নাম নেবে, তিনি ৩৯ বছর বয়সী বুড়ো লিওনেল মেসি। তবে গোটা দুনিয়া মেসির এই অতিমানবীয় ফর্মে চোখ কপালে তুললেও, আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনির কাছে এটা বিন্দুমাত্র বিস্ময়ের নয়। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে স্কালোনি নিজের অধিনায়ককে স্রেফ একটি শব্দে ব্যাখ্যা করেছেন- ‘মেশিন’।

শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে যেভাবে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানের এক অলৌকিক জয় ছিনিয়ে এনেছে, তার নেপথ্য নায়ক ছিলেন এই ইন্টার মায়ামি মহাতারকা। প্রথমার্ধে মেসির নেওয়া পেনাল্টি মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের রুখে দিলে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। এরপর ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর গোলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনা।

কিন্তু ম্যাচের ৭৯ মিনিটে মেসির জাদুকরী ক্রস থেকেই ক্রিস্টিয়ান রোমেরো হেডে প্রথম গোল করেন, আর তার ঠিক পরপরই ক্রসবেন্দী শটে দুর্দান্ত এক গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান এই আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী। শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ ৯২ মিনিটে জয়সূচক গোল করলেও সব হেডলাইন কেড়ে নিয়েছেন মেসিই।

Argentina coach Lionel Scaloni 01
এই এক ম্যাচেই ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওলটপালট করে দিয়েছেন এলএম টেন। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ৬টি ম্যাচে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। একই সাথে বিশ্বকাপে টানা ৯টি ম্যাচে গোল করার কীর্তিও এখন তাঁর ঝুলিতে। চলতি বিশ্বকাপে এমবাপের সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন মেসি। লাতিন ফুটবল ইতিহাসে এক বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড আছে কেবল ব্রাজিলের আদেমিরের (১৯৫০ সালে ৯ গোল)।

৩৯ বছর বয়সী এক বুড়োর এমন দানবীয় পারফরম্যান্স নিয়ে স্কালোনি বলেন, “লিও প্রতি ম্যাচেই প্রায় একই রকম দৌড়ায়। শারীরিকভাবে এটা সত্যি যে ও নিজের ফিটনেস কোচের সাথে জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছে এবং তার ফল হাতেনাতেই মিলছে। তবে ও যখন মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয় এবং বুঝতে পারে যে ও প্রতিপক্ষের জন্য বিপদ তৈরি করতে পারছে, তখন ও শুধু একটা মেশিন!

স্কালোনি সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে বলেন, যাঁরা ভাবছেন বয়সের কারণে মেসি ফুরিয়ে গেছে, তাঁরা আসলে ওকে চেনেই না। আমি কতবার বলব জানি না, মেসি যতদিন নিজে চাইবে, ততদিন ওই পৃথিবীর সেরা ফুটবলার থাকবে। ও আমার দলের খেলোয়াড় বলেই আমি এ কথা বলছি না, এটাই বাস্তব।

কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনার পরবর্তী পরীক্ষা সুইজারল্যান্ড, যারা টাইব্রেকারে শক্তিশালী কলম্বিয়াকে বিদায় করে চতুর্থবারের মতো শেষ আটে উঠেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার রেকর্ড শতভাগ পারফেক্ট; ১৯৬৬ সালে ২-০ এবং ২০১৪ সালে ১-০ ব্যবধানে সুইসদের হারিয়েছিল তারা। ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে সেই ধাক্কার পর থেকে বিশ্বকাপে টানা ১১ ম্যাচ (৯ জয়, ২ ড্র) অপরাজিত আছে আর্জেন্টিনা, যা তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম অপরাজেয় যাত্রা।

Swiss Team 02
তবে এবারের সুইজারল্যান্ড দলটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাছাইপর্ব ও মূল বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা ১১টি ম্যাচে (৬টি বাছাইপর্ব, ৫টি মূল পর্ব) এই সুইসরা একবারের জন্যও ম্যাচে পিছিয়ে পড়েনি- যা চলতি বিশ্বকাপে একমাত্র রেকর্ড! সুইসদের এই নিরেট ধারাবাহিকতা নিয়ে স্কালোনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ওদের দলে শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ কিছু খেলোয়াড় আছে। কলম্বিয়া এই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলছিল, আর সুইসরা তাদেরই বিদায় করে দিয়েছে। তাই ম্যাচটা যে কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে, তা আমরা খুব ভালো করেই জানি।

বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টার এ হাইভোল্টেজ ম্যাচে যে দলই জিতবে, তারা আগামী ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে নরওয়ে অথবা ইংল্যান্ডের। কানসাস সিটির মাঠে আজ মেসির এই বিশ্বরেকর্ডের রথ চলে, নাকি সুইসদের ‘অপরাজিত’ দেয়াল আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে, তা দেখার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে পুরো ফুটবল দুনিয়া!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স