স্পেনকে চাপে ফেলা মুখে সহজ, বাস্তবে যন্ত্রণাদায়ক!

স্পেনের সেই বিখ্যাত পাসিং কারোসেল বা টিকিটাকা পাসিংয়ের চক্রে কীভাবে আর্জেন্টিনাকে পিষে ফেলা যায়, তা হুলেন লোপেতেগির চেয়ে ভালো আর কে জানেন! তবে, স্পেনের এই সাবেক বস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রোববারের মেগা বিশ্বকাপ ফাইনালটি কিন্তু ২০১৮ সালের মাদ্রিদের সেই প্রীতি ম্যাচের ৬-১ গোলের গোল বন্যার কোনো নস্টালজিক পুনরাবৃত্তি হবে না।

২০১৮ সালে লোপেতেগি যখন স্পেনের দায়িত্বে ছিলেন, তখন লিওনেল মেসিহীন আর্জেন্টিনাকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল স্প্যানিশরা। সেই ম্যাচে মাঝমাঠে এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল স্পেন, যা প্রতিপক্ষকে মাঠের ভেতর শুধুই ছায়ার পেছনে ছোটাত।

Qatar coach Julen Lopetegui 01
সেই স্মৃতি মনে করে লোপেতেগি বলেন, ওটা দারুণ এক স্মৃতি, আর্জেন্টিনার মতো বড় দলের বিপক্ষে আমরা সেদিন দুর্দান্ত খেলেছিলাম। মাঝমাঠের জায়গা বন্ধ করে হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলেছিলাম আমরা। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ আলাদা ম্যাচ। আমরা প্রীতি ম্যাচ নয়, বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে কথা বলছি।

স্পেন সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে, যেখানে ফরাসিদের বিপজ্জনক আক্রমণভাগকে তারা এতটাই বোতলবন্দি করে রেখেছিল যে ম্যাচের ৮০ মিনিট পর্যন্ত ফ্রান্স একটি শটও অন-টার্গেট নিতে পারেনি। ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা ম্যাচ শেষে আফসোস করে বলেছিলেন, স্পেনের ওপর আরও ওপর থেকে চাপ (হাই প্রেস) সৃষ্টি করা উচিত ছিল।

তবে লোপেতেগি, যিনি এই বিশ্বকাপে কাতারের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপে স্পেনের গোলরক্ষক ছিলেন, তিনি মুচকি হেসে বলেন, রণকৌশলের বোর্ডে এই পরিকল্পনা দেখতে যতটাই সহজ মনে হয়, স্পেনের জ্যামিতিক ট্রায়াঙ্গেল বা পাসিং ত্রিভুজের ভেতর বল যখন ছুটতে শুরু করে, তখন মাঠে তা করে দেখানো ততটাই কঠিন।

Spain Team 04
লোপেতেগির মতে, তত্ত্বটি খুব সহজ, কিন্তু স্পেনের মতো দলকে প্রেস করা মোটেও সোজা নয়। কারণ দলগতভাবে খেলা বোঝার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাদের। এটি একজন বা দুজন খেলোয়াড়কে প্রেস করার বিষয় নয়; বরং সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় এবং সঠিক মুহূর্তে বল রিসিভ করতে পারে এমন একঝাঁক সম্ভাব্য খেলোয়াড়কে একসাথে ব্লক করার ক্ষমতা থাকতে হবে।

এখানেই শেষ নয়, আরও বড় সমস্যা রয়েছে। স্পেনের ফুটবলাররা শুধু একটি ছকের অংশ নন, তারা ব্যক্তিগতভাবে এতটাই দক্ষ যে, যে কোনো কঠিন ফাঁদ থেকেও নিজেরা একা একাই বল বের করে নিয়ে আসতে পারেন, যা প্রতিপক্ষের প্রেসকে দুর্বল করে দেয়।

শীতের কম্বল আর মাঝমাঠের যুদ্ধ: লোপেতেগি ফুটবলকে শীতের এক ছোট কম্বলের সাথে তুলনা করে চমৎকার এক রূপক ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ফুটবলে কম্বল দিয়ে পা ঢাকলে যেমন মাথা উন্মুক্ত হয়ে যায়, মাথা ঢাকলে পা, ব্যাপারটা ঠিক তেমন। স্পেনের মতো বল পজিশন ধরে রাখা দলের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ যখনই তেড়ে এসে প্রেস করতে যাবে, তখনই কিন্তু স্পেনের সামনে ফাঁকা জায়গা বা স্পেস খুঁজে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে।

Spain Team 02
স্পেনের রক্ষণভাগের চারজন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষক চরম চাপের মুখেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে নিচ থেকে নিখুঁত পাসে আক্রমণ তৈরি করতে পারেন, যা চাপকে মুহূর্তে গোলে রূপান্তর করে। তবে আর্জেন্টিনা দলেও মাঝমাঠে বল ধরে রাখার মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে।

লোপেতেগি মনে করেন, এই ট্যাকটিক্যাল দাবার লড়াইয়ের চেয়েও ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করবে আরেকটি জিনিস, তা হলো স্নায়ুর লড়াই এবং লড়াকু মানসিকতা। দুই দলই তাদের সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছালে সবচেয়ে সেরা জবাবটা দিতে জানে।

বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি নিজেকে এই নতুন যুগের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। লোপেতেগি বলেন, মেসি এখন অন্য গুণাবলী অর্জন করেছেন। তিনি এখন নিজে দৌড়ানোর চেয়ে সতীর্থদের দিয়ে ভালো খেলাচ্ছেন এবং ডি-বক্সে নিজের দৌড়গুলোকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। এই বিবর্তিত মেসি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলোয়াড়, আর আর্জেন্টিনা দলও তাঁর শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য একটু অন্যভাবে খেলছে।

Spain Win 03
অন্যদিকে, স্পেনের আক্রমণের শক্তি কোনো একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা পুরো মাঠজুড়ে ছড়ানো। পেড্রো পোরোর গোল, কুকুরেয়ার ওভারল্যাপ, ফাবিয়ান রুইজ ও মিকেল মেরিনোর অবদান কিংবা পাউ কুবার্সির শট- সবই স্পেনের শক্তির প্রমাণ। স্পেন এমন এক দল যেখানে শুধু ফরোয়ার্ডরা নন, পুরো দল একসাথে আক্রমণ করে এবং পুরো দল একসাথে রক্ষণ সামলায়।

সহজ কথায়, ফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি কম্বলটি নিজের দিকে টানার চেষ্টা করে, তবে স্পেন ওত পেতে থাকবে মাঠের কোনো না কোনো অংশকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিয়ে মরণ কামড় বসানোর জন্য!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স