নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায় ফ্রান্স, ঢাকায় ব্যস্ত সময় পার করছেন রাষ্ট্রদূত

ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে টানা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। নতুন অধ্যায়ের সূচনায় তিনি রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দল, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সবার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন।

এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, অর্থনীতি, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ নানা ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন রাষ্ট্রদূত সেরে-শারলে। সেখানে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, বহুপাক্ষিকতা রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও গণতন্ত্রের প্রতি যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

এরপর তিনি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। দুই বৈঠকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বিভিন্ন স্তরে সম্ভাব্য সহযোগিতা।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূত জানান—মাল্টিল্যাটারাল প্ল্যাটফর্মে শান্তি স্থাপন, শান্তিরক্ষা ও সংলাপভিত্তিক সমাধানে ফ্রান্স বাংলাদেশের দৃঢ় অংশীদার। রাশিয়ার আগ্রাসনের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি হুমকি ও বলপ্রয়োগের রাজনীতির বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থানের ওপর জোর দেন।

বিদ্যুৎ, খনিজ ও সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা ফউজুল কবির খানের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে এএফডি পরিচালিত প্রকল্প এবং জ্বালানি রূপান্তর ও বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় ফরাসি সহায়তা বাড়ানোর আগ্রহ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রদূত।

বাণিজ্য, বস্ত্র ও বেসামরিক বিমান চলাচল উপদেষ্টা শেখ বাশির উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনায় আসে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ইউরোপীয় কোম্পানির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিমানের বহর বাড়াতে এয়ারবাসের প্রস্তাব।

গৃহায়ন উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতে ভূমিকম্প-পরবর্তী নাগরিক সুরক্ষা, নির্বাচন নিরাপত্তা ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। ফরেনসিক প্রশিক্ষণে সাম্প্রতিক সাফল্যও তুলে ধরা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূত ফ্রান্স ও ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশের চলমান নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান এবং ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিমান চলাচলে এয়ারবাসকে কেন্দ্র করে কাঠামোগত অংশীদারত্ব গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। জলবায়ু অভিযোজন, এএফডির দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, শিক্ষা-সংস্কৃতি বিনিময় ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত হয়।

france-Ambassador

এছাড়া আইসিটি উপদেষ্টা ফয়েজ আহমেদ তায়্যবের সঙ্গে বৈঠকে সাইবার নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ ও মহাকাশ প্রযুক্তি—বিশেষত আর্থ-অবজারভেশন স্যাটেলাইট—নিয়ে আলোচনা হয় ফরাসি রাষ্ট্রদূতের।

পরিবেশ উপদেষ্টা সেভেদা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে বৈঠকে সি‌ওপি৩০–এ অর্জন, জলবায়ু অভিযোজন এবং সুন্দরবনের সংরক্ষণে সাম্প্রতিক ৩০ লাখ ইউরো অনুদানের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।

এদিকে নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় দপ্তরে গিয়েও রাষ্ট্রদূত দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মতবিনিময় করেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকায় দায়িত্ব শুরুর পর থেকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শারলে বাংলাদেশ–ফ্রান্স সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে একের পর এক বৈঠক ও আলোচনায় অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।