বঙ্গবন্ধুর আমলেই জিডিপিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছিলো তবে উন্নয়নের জন্য নীতির আপোষ করেননি তিনি। অবিচল কাজ করে গেছেন কৃষক, শ্রমিক সহ সাধারণ মানুষের স্বার্থে। পাঁচ দশকে দেশের অর্থনীতির ঈর্ষনীয় উন্নতির পেছনেও শক্তি যুগিয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও সাহস। তবে এখন উন্নয়ন ভারসাম্যহীন হচ্ছে আর বৈষম্য অনেক বাড়ছে এটি বঙ্গবন্ধুর সাম্যবাদী নীতি দর্শনের সাথে যায়না। জাতীর পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে শুধু তাদেরই পাশে রাখতে হবে যারা নিঃস্বার্থ ও দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। এমন আরো অনেক কিছুই একাত্তরকে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে তার বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জুলিয়া আলম।
জুলিয়া: স্বাধীনতার মাত্র এক বছর পরেই অর্থাৎ বাংলাদেশে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের শুরুতেই আপনি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী হন। সেই সময়ের অর্থনীতি নিয়ে আপনার নিজের কথা শুনতে চাই।
ড. ফরাসউদ্দিন: স্বাধীনতার একটু আগে থেকে শুরু করি। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১।পূর্ব পাকিস্তানে এক লোক এক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে। ৩১৩ টি আসন জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭। তবে সে নির্বাচনেও শতকরা ২৮ ভাগ অর্থাৎ ৮৪ লাখ লোক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। তারা তখনও ছিল এখনও আছে সংখ্যায় হয়তো একটু বেড়েছে এখন। পাকিস্তানীরা যখন চলে যায় স্বাধীনতা যখন আসে তখন পাকিস্তানীরা সবকিছু দুমরে মুচরে ধংস করে আগুন জালিয়ে নষ্ট করে দিয়ে যায়; এটাকে বলে ডিনায়েল পলিসি। অর্থনীতির কিছুই তখন আর অক্ষত ছিলোনা।তারা চাইছিল শুধু জমিন থাক এবং মানুষগুলো মৃতপ্রায় থাক; তাই হয়েছে।
মাঠে ফসল নাই, গুদামে খাদ্য নাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোষাগারে মাত্র ৮৫ ডলার মজুদ আছে। এই নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। চার দিকে শুধু নাই, নাই আর নাই। মিল কারখানা ব্যাংক-বীমা জাতীর পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তিন দিন আগে ৭ ই জানুয়ারি ১৯৭২-এ এগুলো জাতীয়করণ করা হয়।কাজেই একমাত্র আশার আলো তখন ছিল জাতীর পিতার ফিরে আসা; সমস্ত বিপদসংকুল পরিস্থিতি পার করে, প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে, পৃথিবীজুড়ে মানুষের চাপে গণতন্ত্রের চাপে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার চাপে ফিরে এসেছেন তিনি।তাই বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ যেটা ছিল সেটা হলো বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন, তাঁর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব এবং এই দেশের জনমানুষের বিশেষ করে তার ভাষায় চাষা- ভূষা এবং শ্রমজীবী মানুষ যারা তার বন্ধু তাদের উদ্যম, উৎসাহ এবং বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করা ছাড়া তখন বাংলাদেশের আর কিছুই ছিলনা।
অভাব ছিল, হতাশা ছিল কিন্তু তিনি এসে সঙ্গে সঙ্গে গণখাতের উপর আর পাবলিক সেক্টরের উপর কিন্তু নির্ভর করলেন। “যদিও তিনি মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে প্রাইভেট সেক্টর ছাড়া এদেশের অগ্রগতি হবে না। সমাজতন্ত্র এটা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন না কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ধারায় ব্যক্তিখাতের মাধ্যমেই দেশের অগ্রগতি করতে হবে।”
তিনি ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ করলেন। টিসিবি খাদ্যদ্রব্য, চিনি ভোজ্য তেল কেরোসিন এনে বাজারজাত করতো। (শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ তখন কেরোসিন দিয়ে বাতি জ্বালাতো।) এগুলো আমদানি করে আনা হলো এবং অনেকগুলো মঞ্জরি আসলো। কনজ্যুমার্স সাপ্লাই কর্পোরেশন স্থাপন করলেন তিনি পাবলিক সেক্টরে। টিসিবি আমদানি করে আনলো পণ্য আর মঞ্জরি হিসেবে তিনি যা পেলেন সেগুলো জনসাধারণের মধ্যে প্রায় বিনামূল্যে বিতরণ করা হলো। কৃষিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিলেন; সমস্ত উপকরণ প্রায় বিনামূল্যে দেয়া শুরু করলেন।
সারা পৃথিবীতে তখন অসম্ভব মূল্যস্ফীতি শেখ মুজিব সেটিকে “কুচ পরোয়া নেহি” বললেন। অনেক দাম দিয়ে কিনে আনলেন পণ্য, টাকা ছাপালেন ইনফ্লেশন হলো বটে কিন্তু মানুষের কাছে টাকা গেলো তারা ধান চাল ফলাতে শুরু করলো। তিনি বললেন আমি শিল্প চাই বিশেষ করে কুটির শিল্প চাই আমি চাই গ্রামীণ বিদ্যুৎ আমি চাই হাঁস মুরগীর খামার, আমি চাই পরিকল্পিত জনসংখ্যা, আমি তাই স্কুল-কলেজ মাদ্রাসা।
“সবচেয়ে বড় কথা, পরিকল্পনা দলিলে লেখা হলো দারিদ্র নির্মূল এই দেশের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। তিনি বললেন ফিসক্যাল পলিসিও এমন হবে। সর্বাগ্রে সমতাভিত্তিক বিতরণ হবে, বেশি বিত্তবানদের উপর বেশি ট্যাক্স ধার্য করে সেই ট্যাক্সের টাকায় গরীব মানুষের জন্য স্কুল কলেজ মাদ্রাসা এবং উৎপাদনশীল কলকারখানা তৈরি করতে হবে। তিনি বললেন, আমার কৃষকেরা যাতে ভাল থাকে তাদের পণ্যকে বেশি মূল্য দিয়ে কিনতে হবে তাদের ভর্তুকিমূল্যে জিনিষপত্র সরবরাহ করতে হবে।”
জুলিয়া: বলা যায় তখন বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন আপনি।তখন অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কি বলতেন তিনি?
ড. ফরাসউদ্দিন: চারিদিকে তখন নিরাশা; যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক জনসন বাংলাদেশকে বললেন তলাবিহীন ঝুড়ি তাকে অনুকরণ করে ড. কিসিঞ্জারও বলতে শুরু করলেন এর (বাংলাদেশ) কোনো ভবিষ্যৎ নাই এবং হিউজ ফলেন এবং পালকিন সন এর মতো অর্থনীতির প্রফেসররা বললেন বাংলাদেশের অর্থনীতি মোটেও টেকসই হবে না। তারা আরো বললেন, যদি (বাংলাদেশের অর্থনীতি) টেকসই হয় তবে যে কোনো অর্থনীতিই টেকসই হবে আর যদি হয়ও তবে তা হতে ২০০ বছর লাগবে । এরমধ্যেও বঙ্গবন্ধু কিন্তু আশাবাদি থাকলেন; তিনি সারাজীবনই আশাবাদ নিয়ে রাজনীতি করেছেন; ১৩ বছর জেলে থেকেছেন পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন। তিনি বললেন একদম কিচ্ছু হবে না। যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়েছিলো তখনও কোর্ট থেকে বের হয়েই তিনি সবাইকে বলেছিলেন এই গান ধর ‘নওজোয়ান নওজোয়ান বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান। সবাই বলছে মুজিব ভাই করেন কি আমাদের জেল হবে ফাঁসি হবে কালকে ফাঁসি হতে পারে বললেন কুচ পরোয়া নেহি আমাদের কিচ্ছু হবে না আমরা দেশ স্বাধীন করবো আমরা মানুষের মুখে হাসি ফুটাবো, সোনার বাংলা করবো । এমন ছিলো তার প্রত্যয়। সত্যিকারভাবেই তাই হয়েছে ।
“তখন অর্থনীতি শতকরা ১৩ ভাগ সংকুচিত হয়েছিল, তখন বিশ্বব্যাংকের হিসেবে মাথাপিছু আয় ছিলো ৮৫ ডলার সেটিই এখন ২ হাজার ৫’শ ৫৪ ডলার, তখন জিডিপি ছিল ৭’শ কোটি ডলার এখন হয়েছে ৪১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। বঙ্গবন্ধুর সময়েই ৭৪-৭৫ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় রেকর্ড ৮ শতাংশ যা অবাক হওয়ার মতো কাণ্ড। কাজেই তিনিই উচ্চ প্রবৃদ্ধির রাস্তা দেখিয়ে গিয়েছেন।” তিনি জাতিসংঘে গেছেন বলেছেন ভারতের সঙ্গে বার্মার সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আছে তোমরা মেটাতে সাহায্য করবে। এমন প্রত্যেকটা ব্যাপারে কাজ শুরু করে গেছেন তিনি সেই কাজই এখন সমাপ্ত হচ্ছে।
‘‘বঙ্গবন্ধু বোধহয় পৃথিবীতে একমাত্র নেতা ক্ষমতার আগে এবং পরে কোনো পরিবর্তন নাই। আমরা ৩২ নম্বর থেকে গণভবনে আনতে পারি নাই তিনিও আসতে চান নাই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ও আসতে দেন নাই। তিনি বলতেন, বাবা এই তোরা যদি নিয়ে যাস এই যে রমা বাজার করে নিয়ে আসছে আমি তারে জিজ্ঞেস করি জোরে জোরে এটার দাম কত ওটার দাম কত; ইচ্ছা করে করি যাতে তোগো নেতা জানতে পারেন তার রাজত্বে কি হচ্ছে। কোন জিনিসের দাম কতো। ওখানে চলে গেলে তো বাবা কয়েদখানা কেউ শুনতেও তো পারবে না। এটা ছিল মানুষের কাছাকাছি থাকা।”
জুলিয়া: অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তখন বড় বাধাগুলো কি ছিলো? একান্তভাবে বঙ্গবন্ধু কি বলতেন সেসব নিয়ে?
ড. ফরাসউদ্দিন: সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিল যে পাকিস্তানি মালিকরাতো চলে গেল কিন্তু এই দেশের লোকদের কোনো শিল্প কারখানা ছিল না। কাজেই (পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া) শিল্প কারখানাগুলো চালানোর মতো কোনো ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাসিটি ছিল না। এটা তৈরি করতে সময় লাগে। তিনি বাংলাদেশ ম্যানেজমেন্ট ক্যাডার সৃষ্টি করলেন কিন্তু সেটিও তো সময় লাগে।
“সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিল যে পরাধীনতার শৃঙ্খল (১৯০ বছর ব্রিটিশ আর ২৪ বছর পাকিস্তান) যুক্ত হয়ে থেকে একটা জাতির জন্ম হয়েছে। তার মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল তবে ম্যানেজমেন্ট ক্যাপাসিটি ছিল না, নিজের সম্পদকে নিজে ব্যবহার করবো সে আদতও ছিল না আমাদের। সেজন্যই সবকিছু জাতীয়করণ করা হল।” ১০টা সেক্টর কর্পোরেশন করা হলো । ম্যানেজার বাড়ানোর চেষ্টা করা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক স্থাপন করা হলো। ৬ টা ব্যাংক বঙ্গবন্ধু নিজেই নাম দিলেন-সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রুপালী, উত্তরা ও পূবালী। সেভাবেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রচণ্ডভাবে শুরু করলেন তিনি। সবচেয়ে বড় অভাব ছিল দক্ষ জনবল এবং ব্যবস্থাপনা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব যেটা তিনি আমাদের মধ্যে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা মোটামুটিভাবে স্বাবলম্বী অর্থনীতি করবো কিন্তু প্রয়োজনে আমরা বিশ্বব্যাংক ও দাতাবন্ধুদের থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা নেবো। বিশেষ করে প্রযুক্তি সহায়তা, ম্যানেজমেন্ট সহায়তা নেবো। তাই সবচেয়ে বড় অসুবিধাই ছিলো ম্যানেজমেন্ট ও এবং দক্ষ জনবলের তীব্র অভাব।
জুলিয়া: বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি কেমন ছিলো? আপনি গভর্নর থাকাকালে ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির তুলনায় এখন কি দেখছেন?
ড. ফরাসউদ্দিন: বঙ্গবন্ধুর আমলে তো খেলাপি ঋণের প্রশ্নই ওঠে না। তখন শুধু সুদের হারটা সরকার নির্ধারণ করে দিতো। একে বলে ফিসক্যাল অ্যাডমিনিস্টার। তখন শতকরা ৮৭ ভাগ সম্পদ সরকারের হাতে ছিল এবং প্রাইভেট সেক্টর আস্তে আস্তে ডেভেলপ করে। ৭৫ সনে বিয়োগান্তক ঘটনায় বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে, ঘৃণিতভাবে হত্যার পর শাসকরা পাকিস্তানী কায়দায় অর্থনীতি চাইলো। গরীবের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে চাইল তখনই কিন্তু এই খেলাপি ঋণের জন্ম হয়। অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় অসুবিধা হলো ব্যাংক অল্প ছিল যা সব সরকারি খাতে ছিল এবং এগুলো ভালভাবে চালানোর জন্য তিনি দেশে বিদেশে যত বাঙালী ছিলেন করাচিতে যারা দক্ষ লোক ছিলেন তারা ফিরে আসার পরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ঢেলে সাজানো হলো।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাটা একটা গতিময় জিনিষ। অর্থনীতি তখনকার তুলনায় এখন তো অনেক বড় হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার যে পরিধি সেটা কিন্তু ততো বড় হয় নাই। কাজেই একটা টানাপোড়েন আছে। তার চেয়েও বড় কথা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কিছু লোক আর্থিকভাবে অন্যদের তুলনায় বেশি চাঙ্গা হয়। তারা বেশি বেশি লাভ নিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে থাকেন। বিদেশে অর্থ পাচার করেন দেশে ঋণ খেলাপ করেন ট্যাক্স দেন না এভাবেই আসলে বৈষম্য বাড়ে। এখন বৈষম্যই সবচেয়ে বড় অসুবিধা বলে মনে করি আমি। প্রবৃদ্ধির জন্য জনবন্ধু শেখ হাসিনাকে এবং তার সরকারকে অনেক ধন্যবাদ।
“২০০৯ সন থেকে এক নাগারে শুধু একমুখী ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি মানবিক সমৃদ্ধিতে , মানবসম্পদে রূপান্তর এখনো হয় নাই; হতে বাকি আছে। কারণ এখনো কিছু দারিদ্র আছে এখনো কর্মহীনতা আছে; সবচেয়ে বড় কথা এখন বৈষম্য আছে।”
আমি মনে করি ১৯৯৬ সনে শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে গ্রোথ উইথ ইকুইটি নীতিকে প্রতিপাদ্য করে নিয়েছিলেন, শিল্পায়ন ও কাজের মাধ্যমে মানুষের হাতে অর্থ দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন সেটিকে আবার আনা দরকার তবেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরো চাংগা হবে এবং আরো সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ।
জুলিয়া: ক্ষুদ্র ঋণ, এসএমই ঋণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা নিয়ে কথার বুলি শুনছি কিন্তু বাস্তবে উদ্যোক্তারা এখনো উপেক্ষিত। আসলে সমস্যাটা কোথায়? নীতি না বাস্তবায়নে? এর সমাধান কি?
ড. ফরাসউদ্দিন: প্রথমত আমি বলতে চাই ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম বলছে জেন্ডার ইক্যুইটিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; এশিয়ার মধ্যে ফিলিপিনসের পরেই। কাজেই অগ্রগতি হয় নাই বলা যাবে না কিন্তু যতো অগ্রগতি হওয়া উচিত ছিল দেশ যেভাবে এগিয়েছে সেভাবে হয়তো এগোয়নি।কত লোক কাজ করতেন আগে এখন কতো কাজ করছেন সেই হিসেবে হয়তো এগোয়নি। সমস্যাটা নীতিতে নয় নীতির প্রয়োগে। জনবন্ধু শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সাহসী কতগুলো প্রণোদনা প্যাকেজ কিন্তু ঘোষণা করেছেন। এর শতকরা ৭০-৭৫ ভাগই সংগত কারণে শিল্পখাতে গেছে বড় বড় শিল্পখাতে।
“আমাদের ব্যাংকের বন্ধুরা তারা খুব উৎসাহী বড় বড় ঋণ দিতে কারণ সেখানে হয়তোবা জানাশোনা বেশি আছে বা কিছু সুযোগ-সুবিধাও থাকতে পারে। কিন্তু যারা কুটির শিল্প করে অতি ক্ষুদ্রশিল্প করেন অথবা যারা মহিলা উদ্যোক্তা তাদের উদ্যোগগুলো ছোট হয় যদিও খাটনি নাকি সমানই এদের কিন্তু খেলাপি খুব কম হয় কাজেই এদের দিকে মনোযোগ দেয়ার জন্য প্রচলিত নীতি মনে হচ্ছে যথেষ্ট নয়।”
কাজেই নতুন করে নীতি করতে হবে এবং নতুন করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা করতে হবে। তিনটা প্রতিষ্ঠান আছে পিকেএসএফ, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বিসিক- বিসিককে সবাই বেশি ভালো সংস্থা বলে না তবে আমি মনে করি বিসিককে আমূল পরিবর্তন করে সংস্কার করে বিসিককে লিড এজেন্সি করে কুটির, অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র শিল্পের পাইলট বানাতে হবে। এখানে শতকরা ২ থেকে ৩ ভাগ সুদে উদ্যোক্তারা সহজভাবে ঋণ পেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সেইখানে শতকরা ৪০ ভাগ ঋণ যেন মহিলাদের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ থাকে। এই যে বলা হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আছেন তাদের মধ্যে প্রত্যেক বছর ৫ লাখ শনাক্ত করে তাদেরকে ট্রেনিং দিতে হবে উদ্যোক্তা বানাতে হবে এবং বিসিকের আমব্রেলায় ব্যাংকগুলার মাধ্যমে তাদের ঋণ দিতে হবে। তাদের প্রকল্প চিহ্নিত করতে হবে প্রকল্প তদারকি করতে হবে এবং বাজারের কোনো অভাব নাই। যে যেসমস্ত কৃষিভিত্তিক শিল্প রয়েছে মূলধন কম লাগে বাজার আছে এতে প্রচুর কর্মসংস্থান হয় দারিদ্র নির্মূল হয় আয় রোজগার হয় এবং বৈষম্য দূর হয়। আমাদের গরীব মানুষ যারা বাংলাদেশের প্রাণ বলে জাতির পিতা বলে গেছেন এবং জনবন্ধু শেখ হাসিনাও বিশ্বাস করেন তারা যখন আরো বড় হবেন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান যখন মজবুত হবে তখন তাদের ছেলেমেয়েকে তারা ভালো স্কুলে পাঠাতে পারবেন ভাল কাপড় দিতে পারবেন সুষম খাবার দিতে পারবেন তখন তারা কিন্তু বিত্তবানদের ছেলেমেয়েদের সাথে সমানে সমানে টেককা দিয়ে চাকরি ব্যবসায় প্রতিযোগিতা করতে পারবেন।

জুলিয়া: একদিকে অর্থনীতির উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ছে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের বিশ্বতালিকা থেকে বের হচ্ছি একই সময়ে জীবন চালাতে দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের কষ্ট বাড়ছে। বিষয়গুলো নিয়ে আপনার ভাবনা কি? এর সমাধান কি?
ড. ফরাসউদ্দিন: দেখুন আজকে যে কম বিত্তের মানুষ বা গরীব মানুষ তিনি কিন্তু ৫০ বছর আগের গরীবের তুলনায় অনেক ভাল আছেন।
“তুলনাটা হচ্ছে ৫০ বছর আগের ধনীর সাথে তখনকার গরীবের যে ব্যবধান ছিল সেই তুলনায় এখন বিত্তবানের সংগে গরীবের ব্যবধানটা অনেক বেড়ে গেছে। এটা মনুষ্যসৃষ্ট এবং এটাকে দমন করতে হবে।”
৭০ এর দশকে পৃথিবীতে একটা ক্যাটাগরি হয় আনডেভেলপড কান্ট্রি- অনুন্নত দেশ; মিসকিন যে বলে মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা। তিনি দেখলেন মহা ফ্যাসাদ। জাতিসংঘকে দরখাস্ত দিলেন ৭৪ সনে আমরা উনার সংগে গেছি জাতিসংঘে দরখাস্ত দিয়েছেন তিনি যে আমাদেরকে বাবা এলডিসি করে দাও স্বল্পোন্নত। তিনি করলেন অনুন্নতকে স্বল্পোন্নত আর তার সন্তান ২০১৭ সনে স্বল্পোন্নতকে করলেন উন্নয়নশীল। তিনটা পরীক্ষা-জিএনআই পার ক্যাপিটা ইনকাম, ইকোনোমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স এবং হিউম্যান অ্যাসেট ইনডেক্স সূচকে একসঙ্গে প্রথম হয়ে আমরা গ্রাজুয়েশনের জন্য পাশ করলাম। চ্যালেঞ্জ কিন্তু মাত্র শুরু হয়েছে; চ্যালেঞ্জটা হলো এখন এটাকে ধরে রাখা। অনেকে বলছে রপ্তানি কমে যাবে; বাজে কথা আমি যখন ডেভেলপিং কান্ট্রি হবো সবাই সম্মান করবে তখন আর এলডিসিকেতো সবাই দূরে রাখে, ঘৃণা করে।এখন আমাদের সাথে সবাই ট্রেড করতে চাইবে।আসল কথ হলো ঐ যে বললাম, কাউকে পেছনে রাখা যাবে না।
শিল্পায়ন করতে হবে এই যে বিশেষ শিল্প অঞ্চলগুলো আছে ১০টিতো রেডিই আছে সেখানে খুব বড় বড় শিল্প বিশেষ করে বস্ত্র শিল্প, চামড়া শিল্প, ওষুধ শিল্প গাড়ী শিল্প করতে হবে যাতে জিডিপিতে বড় প্রবৃদ্ধি হয়। কুটির, ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র আর আমি দেখেছি এসএমই ফাউন্ডেশনের মেলায় মানুষের ঢল নামে সেটি ভালো লক্ষণ তাদের কিন্তু ঐ সমস্ত শিল্প অঞ্চলে জমি দিতে হবে। আমি বলেছি তাদেরকে প্রকল্প তৈরি করে দিতে হবে, তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, দুই থেকে তিন শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। কোনো জামানতের দরকার নাই প্রকল্পই হবে তাদের কোলেটেরাল। জামানত জরুরি নয়, তাদের তদারকি করা জরুরি। তাদের শেখাতে হবে, বাজার নিরীক্ষা করতে হবে। দুধ থেকে তারা পনির বানাবে, মিষ্টি বানাবে, আনারস থেকে জ্যাম জেলি বানাবে সব কিন্তু প্রস্তুত। এই যে বাংলাদেশের ফুল এত সুন্দর সেগুলো সুন্দর করে প্যাক করে রপ্তানি করবে, ভেজিটেবল রপ্তানি করবে। এই উদ্যোক্তারা যদি কটু কথাও বলেন তাদেরকে ডেকে এনে তাদের পরামর্শ বিবেচনা করতে হবে। আমার শহর আর গ্রামের ব্যবধান ঘোচাতে গ্রামভিত্তিক শিল্প কলকারখানা করতে হবে। তবে যারা কৃষিকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে করছেন, অনেক লাভ করছেন তাদের কিন্তু কর দিতে হবে।
বড় বড় মেগা প্রকল্প হয়েছে; কোনো উপায় ছিলনা করতেই হবে কারণ নাহলে নগর বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। আর এগুলো তো প্রবৃদ্ধিতে শক্তির যোগান দিবে।
“বিশ্বখ্যাত বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ ২০১৫ বলেছে বাংলাদেশে ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) লোক আছে যাদের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ডলার তাদের সবারই ট্যাক্স নেয়া যায়। প্রতিবছর আরো ২০ লাখ লোক যোগ হচ্ছে। তাহলে এখন দুই কোটি লোক ট্যাক্স দেয়ার কথা কিন্তু দিচ্ছে ২০ লাখ। তারাই টাকা পাচার করছে, তারাই কর খেলাপি; এটা হতে পারে না”
জোর করার কিছু নাই তাদের বুঝাতে হবে। তারা অবশ্য দুর্নীতির কথা বলে যে আমরা ট্যাক্স দিবো আর লোকজন ২৭ কোটি টাকায় বালিশ কিনবে এটা হতে পারে না। কাজেই সরকারি ক্রয় বিশ্বমানে তুলনা করে উপযুক্ত মূল্য বেঁধে দিয়ে সেই দামেই টেন্ডার দিতে হবে। একটা রাস্তা বানাতে ১ কিলোমিটারে ১০০ কোটি টাকা লাগবে না এটা ২০ কোটির মধ্যে সারতে হবে। এভাবে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি বার বার বলছি মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, এবং নিঃস্ব লোক এদেশের প্রাণ। আর সঞ্চয়পত্রসহ অবসরভোগি মানুষের জীবন জীবিকার মাধ্যমগুলোকে সোশাল সিকিউরিটি সাপোর্ট হিসেবে দেখতে হবে। সব ক্ষেত্রে চিন্তা ভাবনা করে নীতি কৌশল নিয়ে বাস্তবায়ন করে পেছনে পড়াদের সামনের কাতারে নিয়ে আসাই কাজ। কাউকে উপর থেকে নিচে নামানোর দরকার নাই। নিচে যারা আছে তাদেরকে শুধু উপরে ওঠাতে হবে এখন।
জুলিয়া: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন দেখতে পাচ্ছেন আপনি? আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান?
ড. ফরাসউদ্দিন: আমি দেখতে চাই বিজয়ের সিংহতোরণ। মানস-চক্ষে দেখতে পাচ্ছি এটা যেন ক্রমেই কাছে চলে আসছে। আমি হয়তো থাকবো না, আমি হয়তো দেখবো না কিন্তু আজকের যারা তরুণ তরুণী সকলে মনেপ্রাণে সাধারণ মানুষের সংগে একযোগে কাজ করবে দেশটাকে গড়ে তুলবে এবং বৈষম্য দূর হবে। সবাই সম্মানের সঙ্গে, স্বাস্থ্যের সঙ্গে, শিক্ষার সঙ্গে বড় হবে এবং দেশ সোনার বাংলা হবে, কল্যাণ রাষ্ট্র হবে। আমার মনে হচ্ছে যে নীতি কৌশলে যদি এই পরিবর্তনটা আনা যায় যে মডেলটা দারিদ্র নিবারণের মডেল না করে শিল্পায়নের মাধ্যমে অগ্রগতি। বড় শিল্প একভাগে মাঝারি শিল্প একভাগে এবং কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র একভাগে। খুব বড় ধরনের অগ্রাধিকার দিয়ে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে। একটা কথা না বললেই না; সিভিল সার্ভিস এটাকে কিন্তু যুগোপযোগী করতে হবে। এই সবক্ষেত্রে এগুলো করলে আমার যে সোনার বাংলাকে শ্মশান করে গিয়েছিল ইংরেজরা এবং পাকিস্তানীরা আবার সোনার বাংলা সেই সোনার বাংলায় রূপান্তর হবে।
জুলিয়া: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!
ড. ফরাসউদ্দিন: আপনাকে এবং একাত্তর পরিবারকেও ধন্যবাদ।
একাত্তর/এসি
